সরকারের ঋণ বাড়লে মানুষের কষ্ট বাড়ে কেন?

সম্প্রতি ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালসহ ইউরোপজুড়ে জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ, কম মজুরি এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাজেট-সংকটের প্রতিবাদে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন। ফ্রান্সে শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি কেন্দ্র করে আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে সবচেয়ে বেশি।

এই অসন্তোষের মূল কারণ হলো বছরের পর বছর অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে ইউরোপের অনেক দেশ দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে এবং বর্তমানে সেই ঋণের সুদের বোঝা বইতে গিয়ে সামাজিক খাতগুলোতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ দিতে পারছে না।

সরকার মূলত বন্ড বিক্রির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ঋণ সংগ্রহ করে থাকে। তবে বন্ডের বাজারে ঝুঁকি বাড়লে বা বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা বেশি হারে রিটার্ন দাবি করেন। ফলে নতুন করে বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নেওয়া সরকারের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ২০০০-এর দশকের পর ইউরো অঞ্চলের প্রধান দেশগুলোর জন্য ১০ বছর মেয়াদি ঋণের সুদের হার এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্সকে বর্তমানে রেকর্ড পরিমাণ প্রায় পাঁচ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে, যা এমনকি ইতালি বা গ্রিসের চেয়েও বেশি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিভিন্ন আর্থিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সরকারি ঋণের বহর লাফিয়ে বাড়ছে। এই তালিকার শীর্ষে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার বা তাদের মোট জিডিপির ১২৭ শতাংশ। এরপরে চীনের ঋণ ২২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১০৪ শতাংশ, জাপানের ঋণ ৮.৭ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১৯৯ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যের ঋণ ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ১০২ শতাংশ।

এছাড়া চার দশমিক দুই ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ফ্রান্স, যা তাদের জিডিপির ১১৮.৫ শতাংশ। অন্যদিকে আইএমএফের তথ্যমতে, এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা বা প্রায় ২০৪.৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ।

উন্নত দেশগুলো গত এক বছরে কেবল সরকারি বন্ডের সুদ মেটাতেই তিন দশমিক তিন ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছে, যা সামরিক খাত বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পেছনে খরচ করা মোট অর্থের চেয়েও বেশি। সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধের এই বিশাল খরচ সরাসরি প্রভাব ফেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। ঋণের সুদ দিতে গিয়েই সরকারের আয়ের বড় অংশ চলে যায়, যার ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, পেনশন ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো

মৌলিক খাতগুলোতে বাজেট কাটছাঁট করতে হয়। ঋণের দায় মেটাতে সরকারকে প্রায়শই নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান করের হার বাড়াতে হয়, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি সরকারি ঋণের ওপর সুদের হার বাড়লে দেশের সার্বিক অর্থবাজারে তার প্রভাব পড়ে। এতে ব্যাংক থেকে নেওয়া বন্ধকী ঋণ, গাড়ির ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বেড়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক সামর্থ্য মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়।

Related Articles

Back to top button