কতটা প্রস্তুত মতিঝিল-কমলাপুর মেট্রোরেল?

রাজধানীর মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬) সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ চলছে প্রায় ৪২ মাস ধরে। এই সময়ে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) লক্ষ্য অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে এই বর্ধিত অংশে পরীক্ষামূলক ট্রেন (ট্রায়াল রান) এবং একই বছরের এপ্রিলে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমান কাজের গতি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে এই লক্ষ্য অর্জন করা যাবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সম্প্রসারণ কাজ শুরু হয়। প্রথম বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি ছিল ২৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের এপ্রিল নাগাদ দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। আর সর্বশেষ ১৩ মাসে সম্পন্ন হয়েছে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ কাজ।

হিসাব অনুযায়ী, গত ৪২ মাসে কাজের গড় অগ্রগতি ছিল মাসিক ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ফলে ২০২৭ সালের জানুয়ারির লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামী ৬ মাসে ডিএমটিসিএল-কে কাজের গতি প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে গড়ে ৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ হারে এগিয়ে নিতে হবে।

প্রকল্পের অগ্রগতি সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের কাজ এখন পুরোদমে চলছে। গত ৩০ জুন পর্যন্ত সব পাইলক্যাপ, পিয়ার ও স্টেশন কলামের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। উত্তরা কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে প্রয়োজনীয় ২৯৮টি প্রিকাস্ট সেগমেন্টের শতভাগ কাস্টিং এবং মোট ২৭টি স্প্যানের মধ্যে ২৫টি স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া উড়ালপথের ১৮০ মিটার কনকোর্স ছাদ, ট্র্যাক স্ল্যাব ও প্ল্যাটফর্ম স্ল্যাবের ঢালাই কাজ পুরোপুরি শেষ। উড়ালপথের দুই পাশের ৮২৪টি প্রিকাস্ট প্যারাপেট ওয়ালের সবগুলোরই নির্মাণ শেষ হয়েছে।

কমলাপুর স্টেশনের মূল স্থাপত্যশৈলী ও সবুজ রঙের দৃষ্টিনন্দন ছাউনি এখন পুরোপুরি দৃশ্যমান, যেখানে এখন কেবল গ্লাস বা কাচ স্থাপনের কাজ বাকি রয়েছে। স্টেশনের ভেতরের প্ল্যাটফর্মের ঢালাই সম্পন্ন হওয়ার পর এখন ওয়াশরুম নির্মাণসহ আর্কিটেকচারাল ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে। উচ্ছেদ ও জটিলতা পেরিয়ে ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড এই ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে।

২০২৪ সালে ঠিকাদার নিয়োগ এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই প্রকল্পের ইলেকট্রোমেকানিক্যাল কাজ নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছিল এবং কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে সেই জটিলতা কাটিয়ে ভারতের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘লারসেন অ্যান্ড টুব্রো’কে (এলঅ্যান্ডটি) এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি সিগন্যালিং, কমিউনিকেশন ও অন্যান্য ইলেকট্রোমেকানিক্যাল কাজ পরিচালনা করছে।

এমআরটি লাইন-৬-এর প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব জানান:

“বর্তমানে সিভিল ওয়ার্কের পাশাপাশি স্টেশনের ফিনিশিং, টাইলস-মার্বেল বসানো, ফায়ার ফাইটিং ব্যবস্থা, লিফট ও এসকেলেটর স্থাপন, রেলট্র্যাক বসানো এবং সিগন্যালিংয়ের কাজ চলছে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে রাতের বেলা উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পুরো রুটে ট্রায়াল রান পরিচালনা করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৭ সালের এপ্রিলে বাণিজ্যিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হবে।”

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান জানান, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা অনেকটাই নির্ভর করবে ঠিকাদারের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর। যেহেতু অধিকাংশ সামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, তাই সরঞ্জাম দ্রুত দেশে আনা এবং ঠিকাদারকে ২৪ ঘণ্টা কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন:

“বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সিগন্যালিং ও কমিউনিকেশন ব্যবস্থা স্থাপন। যেহেতু ভারতের লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (এলঅ্যান্ডটি) বিদ্যমান এমআরটি লাইন-৬-এর সিস্টেমের সঙ্গেও যুক্ত ছিল, তাই নতুন অংশের সঙ্গে বিদ্যমান লাইনের সফল সমন্বয় (ইন্টিগ্রেশন) তুলনামূলক সহজ হওয়ার কথা।”

২০১২ সালে প্রথম অনুমোদনের সময় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। পরবর্তীতে কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত অংশ যুক্ত হওয়ায় ২০২২ সালের দ্বিতীয় সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

তবে সর্বশেষ প্রস্তাবিত তৃতীয় সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ বা ৭৫৪ কোটি টাকা কমিয়ে মোট ব্যয় ৩২ হাজার ৭১৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

Related Articles

Back to top button