‘ব্যথা’ না পাওয়ার অভিশাপে আক্রান্ত তারা: বাংলাদেশে বিরল সিপা (CIPA) রোগের নজির


ব্যথা—মানুষের শরীরের এক অপরিহার্য প্রাকৃতিক সতর্কবার্তা। আঘাত পেলে এই অনুভূতিই মানুষকে বড় কোনো বিপদ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু ব্যথাই যদি অনুপস্থিত থাকে? এমন এক বিরল ও অভিশপ্ত জিনগত ব্যাধিতে ভুগছে বেশ কিছু শিশু, যার নাম কনজেনিটাল ইনসেনসিটিভিটি টু পেইন উইথ অ্যানহাইড্রোসিস (CIPA)।
সম্প্রতি বাংলাদেশের ইফফাত নামের ১৮ মাস বয়সী এক শিশুর শরীরে এই বিরল রোগটি শনাক্ত হয়েছে। দাঁত দিয়ে নিজের জিহ্বা কেটে ফেলা বা গোড়ালির হাড় টুকরো টুকরো হয়ে গেলেও ব্যথার কোনো অনুভূতি ছিল না তার।
CIPA আসলে কী?
মেডিকেল বিজ্ঞানে এটি হেরেডিটারি সেন্সরি অ্যান্ড অটোনমিক নিউরোপ্যাথি (HSAN) টাইপ-IV নামে পরিচিত। বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ লাখ শিশুর মধ্যে একজন এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
-
ব্যথাহীনতা: আক্রান্ত ব্যক্তি হাড় ভাঙা, ছ্যাঁকা লাগা কিংবা শরীর কেটে যাওয়ার মতো গুরুতর আঘাতেও কোনো ব্যথা অনুভব করে না।
-
ঘাম না হওয়া (অ্যানহাইড্রোসিস): এদের শরীরে ঘাম হয় না। ফলে গরমে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায় এবং প্রায়ই ১০৪-১০৫ ফারেনহাইট পর্যন্ত মারাত্মক জ্বর উঠতে পারে।
-
আত্ম-আঘাত: অবচেতনভাবেই শিশুরা নিজের জিহ্বা, ঠোঁট কিংবা আঙুল কামড়ে ক্ষত তৈরি করে ফেলে।
NTRK1 জিনের ত্রুটি: ১ নম্বর ক্রোমোজোমে অবস্থিত NTRK1 জিনে মিউটেশনের কারণে এই রোগটি হয়। এই জিনটি স্নায়ুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় রিসেপ্টর তৈরি করে। এতে ত্রুটি দেখা দিলে ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ুগুলো ঠিকভাবে বিকশিত হতে পারে না।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতালের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সামছুন নাহার সুমি ৯ মাসের ইফফাতের রক্তের নমুনা ভারতের ‘মেডজিনোম ল্যাবে’ পাঠিয়ে হোল এক্সোম সিকোয়েন্সিং (WES) পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নিশ্চিত করেন।
এর আগে ২০২২ সালে জার্নাল অব কারেন্ট অ্যান্ড অ্যাডভান্স মেডিকেল রিসার্চ-এ দেশের প্রথম সিপা রোগীর কেস রিপোর্ট প্রকাশ করেন ডা. মো. আবদুল্লাহ ইউসুফ এবং ডা. মো. মুরাদ হোসেন।
| বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে সিপা রোগের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ |
| ব্যয়বহুল পরীক্ষা: দেশে জিনগত পরীক্ষা সহজলভ্য না থাকায় বিদেশে নমুনা পাঠাতে হয়, যা অধিকাংশ পরিবারের সাধ্যের বাইরে। |
| সচেতনতার অভাব: প্রাথমিক লক্ষণ দেখে অনেক সময় চিকিৎসকরাও রোগটি চিনতে পারেন না; ফলে ভুল চিকিৎসার শিকার হতে হয়। |
| জাতীয় নিবন্ধনের অভাব: কতজন রোগী দেশে রয়েছেন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান বা ন্যাশনাল রেজিস্ট্রি নেই। |
জেনেটিক কাউন্সেলিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের (জিসিআরসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মুশফিকা রহমান এবং বিএসএমএমইউ-এর প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল জানান—
-
CIPA একটি অটোসোমাল রিসেসিভ বংশগত রোগ।
-
বাবা-মা দুজনই ত্রুটিপূর্ণ জিনের বাহক হলে প্রতিটি গর্ভধারণে সন্তানের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ২৫%।
-
নিকটাত্মীয়ের (যেমন: খালাতো/মামাো ভাই-বোন) মধ্যে বিয়ে হলে এই ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তানের মধ্যে আসার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
এখন পর্যন্ত CIPA-এর সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। আক্রান্ত শিশুদের রক্ষায় একমাত্র উপায় হলো সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক যত্ন:
-
আঘাত প্রতিরোধ: শিশুকে সর্বক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখা, আঘাত লাগে এমন বস্তু থেকে দূরে রাখা এবং বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক গিয়ার (যেমন: এএফও সাপোর্ট) ব্যবহার করা।
-
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: ঠান্ডা পরিবেশে রাখা, নিয়মিত গা মুছে দেওয়া ও জ্বর দ্রুত কমানোর ব্যবস্থা করা।
-
জেনেটিক কাউন্সেলিং ও পিজিটি: ঝুঁকিপূর্ণ দম্পতিদের ক্ষেত্রে গর্ভধারণের ১১ সপ্তাহে ডিএনএ পরীক্ষা বা আইভিএফ (IVF)-এর মাধ্যমে পিজিটি (PGT) ব্যবহার করে সুস্থ ভ্রূণ নির্বাচন করা সম্ভব।




