মধুপুরের পাহাড়িয়াদের আগাছা বিক্রি যেন এক ভিন্ন পেশা


মেহেদী হাসান বকুল, টাঙ্গাইল: আগাছা মানেই যার স্থান আবর্জনা বা ময়লার ভাগারে—এমন ধারণাই স্বাভাবিক। কিন্তু টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের পাহাড়িয়া অঞ্চলে এই আগাছাই এখন বহু মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন ও জীবিকার অনন্য এক মাধ্যম। আনারস, কলা, পেঁপে, আদা, কচু ও হলুদের আবাদের জন্য সারা দেশেই পরিচিত মধুপুরের লাল মাটির পাহাড়ি অঞ্চল। ফলের প্রাচুর্যের এই জনপদে ফল-ফসলের সাথে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে নানা জাতের ঘাস ও আগাছা।
কৃষকের কাছে এসব আগাছা ক্ষতিকর বা অপকারী হলেও, গারোবাজার ও মোতেরবাজার এলাকার দরিদ্র মানুষের জন্য তা হয়ে উঠেছে জীবিকার আশীর্বাদ। ফল পরিবহনের সময় সুরক্ষার কাজে এসব আগাছার ব্যাপক চাহিদা থাকায় এখন অনেকেই আগাছা সংগ্রহ ও বিক্রিকে মূল পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
একসময় দেশের বিভিন্ন জেলায় ট্রাকে করে আনারস পাঠানোর সময় নষ্ট বা পচন থেকে রক্ষার জন্য খড় ব্যবহার করা হতো। তবে খড়ের দাম বৃদ্ধি পাওয়া এবং খড়ে আনারস দীর্ঘক্ষণ সতেজ না থাকায় পাইকার ও ব্যবসায়ীরা এখন ঝোঁক বাড়িয়েছেন সবুজ আগাছার দিকে। এসব আগাছার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে জগৎবেড়, জার্মানলতা, শটি গাছের পাতা এবং বড় আকারের নানা জাতের বুনো ঘাসের। ব্যবসায়ায়ীরা জানাচ্ছেন, খড়ের চেয়ে সবুজ আগাছা দিয়ে আনারস মুড়িয়ে ট্রাকে তুললে ফল অনেক বেশি সতেজ থাকে। গন্তব্যে পৌঁছানোর পরও আনারসের রঙ ও মান নষ্ট হয় না। এছাড়া কুলি ও শ্রমিকদের মতে, খড়ের চেয়ে আগাছা দিয়ে আনারস সাজানো অনেক আরামদায়ক ও পরিচ্ছন্ন, কারণ এতে কোনো ময়লা বা ধুলোবালি থাকে না।
গারোবাজার এলাকার ভ্যানচালক ও উদ্যমী পরিশ্রমী মানুষরা সকাল থেকে ঝোঁপ-ঝাড়, বন এবং আনারস-কলার বাগানের আশপাশ থেকে এসব আগাছা কেটে বাজারে নিয়ে আসেন। কোনো প্রকার আর্থিক বিনিয়োগ বা খরচ ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে এগুলো সংগ্রহ করা যায় বলে দরিদ্র মানুষেরা এতে বেশ লাভবান হচ্ছেন। মোনিনপুর গ্রামের শামছুল আলম জানান, জ্যৈষ্ঠ থেকে ভাদ্র মাস—মূলত আনারসের মৌসুমে তিনি ও তার সন্তান মিলে আগাছা সংগ্রহ করেন। প্রতি ভ্যান আগাছা ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় এবং মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে প্রতিদিন ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব হয়। এছাড়া আব্দুর রশিদের মতো অনেকেই সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির আশপাশ থেকে জগৎবেড় ও জার্মানলতা টেনে তুলে বাজারে নিয়ে নগদ ৩ থেকে ৪শ টাকায় বিক্রি করে সংসার চালান।
মধুপুরের এগ্রো’র সত্ত্বাধিকারী ইদ্রিস কাজল বলেন, দুর্মূল্যের বাজারে ফেলে দেওয়া আগাছাও যে অভাবী মানুষের বেঁচে থাকার মাধ্যম হতে পারে, তা ভাবতেই ভালো লাগে। আনারস ক্রেতা ও পাইকারদের মতেও খড়ের তুলনায় আগাছা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং ফল সুরক্ষায় বহুগুণ কার্যকর। জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত আনারসের ভরা মৌসুমে এই আগাছা ব্যবসার পরিধি আরও বেড়ে যায়। পরিশেষে, কৃষকের কাছে অবহেলিত এই আগাছাই মধুপুরের পাহাড়িয়া অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জীবনে এনে দিয়েছে স্বস্তি ও জীবিকার এক নতুন দিগন্ত।




