ডায়াবেটিসের নতুন ধরণ ‘টাইপ ৫’, কারা বেশি ঝুঁকিতে?

রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে সাধারণত সেটিকে ‘টাইপ ১’ বা ‘টাইপ ২’ ডায়াবেটিস হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন সম্পূর্ণ নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘টাইপ ৫’ ডায়াবেটিস। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির কারণে এ ধরনের ডায়াবেটিসের সৃষ্টি হতে পারে।

রোগটি সঠিকভাবে শনাক্ত না হওয়ায় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন, যা কিছু ক্ষেত্রে প্রাণঘাতীও হতে পারে। আলবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিনের গ্লোবাল ডায়াবেটিস ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মেরেডিথ হকিন্স বলেন, “টাইপ ৫ ডায়াবেটিস শনাক্ত করতে না পারা একটি বড় বৈশ্বিক সমস্যা। ভুলবশত অনেক রোগীকে ইনসুলিন দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।”

  • টাইপ ১ ডায়াবেটিস: এটি একটি অটোইমিউন রোগ। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ ধ্বংস করে দেয়, ফলে শরীর ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না।

  • টাইপ ২ ডায়াবেটিস: এতে শরীর ইনসুলিন তৈরি করলেও সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না, যাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়।

  • টাইপ ৫ ডায়াবেটিস: বিজ্ঞানীদের মতে, এটি দীর্ঘদিনের অপুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদিত হয় না। একই সঙ্গে এসব রোগী ইনসুলিনের প্রতি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হতে পারেন। ফলে প্রচলিত চিকিৎসা অনেক সময় কার্যকর হয় না, উল্টো স্বাভাবিক মাত্রার ইনসুলিনও রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) দিতে পারে।

বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এই ডায়াবেটিস তুলনামূলক বেশি দেখা যায়, যার প্রধান কারণ শৈশবের দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি। কম ওজনের তরুণদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়।

টাইপ ৫ ডায়াবেটিসের উপসর্গগুলো অন্যান্য ডায়াবেটিসের মতোই। এর মধ্যে রয়েছে—

  • অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও ক্ষুধা লাগা

  • ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া এবং দ্রুত ওজন কমে যাওয়া

  • সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগা ও শরীর কাঁপা বা দুর্বল অনুভব করা

  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া ও চোখে ঝাপসা দেখা

সঠিক চিকিৎসা না হলে এই ডায়াবেটিস থেকেও অন্ধত্ব, কিডনি বিকল হওয়া, স্নায়ুর ক্ষতি এবং দীর্ঘদিনেও ক্ষত না শুকানোর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

টাইপ ৫ ডায়াবেটিস শনাক্তের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষা না থাকায় এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। ১৯৮৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এটিকে ‘অপুষ্টিজনিত ডায়াবেটিস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ১৯৯৯ সালে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে তা প্রত্যাহার করে। ডব্লিউএইচও এখনো এটিকে পৃথক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও, সম্প্রতি ২০২৫ সালের এপ্রিলে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) আনুষ্ঠানিকভাবে টাইপ ৫ ডায়াবেটিসকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ড. মেরেডিথ হকিন্স জানান, খুব শিগগিরই বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকদের বহুল ব্যবহৃত ‘ডিগ্রুট’স এন্ডোক্রিনোলজি’ গ্রন্থে টাইপ ৫ ডায়াবেটিস নিয়ে পৃথক অধ্যায় যুক্ত হতে যাচ্ছে, যা এই রোগের সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Related Articles

Back to top button