আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ মন্তব্যে দেশজুড়ে বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড়


আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে—পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্যের পর দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত সোমবার সকালে রাজধানীর চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে আমরা সেটাই করব।’
পুলিশের সর্বোচ্চ পদে থেকে তাঁর এমন বক্তব্যের পর বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে—ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভূত বলপ্রয়োগের অনুমতি দেওয়ার আইনি ক্ষমতা সরকারের আছে কি না এবং সংবিধান ও প্রচলিত আইনের আলোকেই বা এর ভিত্তি কী।
আইজিপির এই বিতর্কিত বক্তব্যের পর সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একপর্যায়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে তাঁর পদত্যাগের দাবি ওঠে।
তীব্র সমালোচনার মুখে সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি স্পষ্টীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সদর দপ্তরের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা এ কে এম কামরুল আহসান স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে পুলিশের কঠোর অবস্থান প্রকাশ করতেই আইজিপি শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেছেন। কোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা অনিয়মতান্ত্রিক শাস্তির উদ্দেশ্যে এই মন্তব্য করা হয়নি বলে দাবি করে পুলিশ সদর দপ্তর।
তবে আইনশৃঙ্খলা ও আইন বিশেষজ্ঞরা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি। সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা জানান, প্রচলিত আইন বা পুলিশের রেগুলেশনে ‘ক্রসফায়ার’ বলে কিছু নেই। কাউকে হেফাজতে নিয়ে গুলি করা মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং নির্বাহী বিভাগের অনুমতিও এমন কাজকে বৈধতা দিতে পারে না। নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং জাতিসংঘের কাছে মানবাধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, এ ধরনের বক্তব্য তার সঙ্গে পুরোপরি সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান সতর্ক করে জানান, এ ধরনের বক্তব্যের পর কোনো ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটলে হুকুমদাতা হিসেবে আইজিপিসহ সংশ্লিষ্টরা দণ্ডবিধির ৩০২ ও ১০৯ ধারায় অভিযুক্ত হতে পারেন। এমনকি সাধারণ নাগরিকেরা চাইলে দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারায় মামলাও করতে পারেন।
আইজিপির বক্তব্যকে সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বক্তব্য প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়ে বলেন, সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার যে মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত আছে, তা নির্বাহী আদেশে বাতিল হতে পারে না।
অনুরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এবং আইন ও সালিস কেন্দ্র। এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, অপরাধ দমনে বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়া ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা বাধ্যতামূলক, ক্রসফায়ার কোনো অবস্থাতেই সঠিক বিচার ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না।




