নেতানিয়াহুর আমিরাতে গোপন সফর: কারণ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট


ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেজ্জামানিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি সংক্ষিপ্ত সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবিতে গিয়ে সেখানে প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে একটি গোপন বৈঠক সম্পন্ন করেছেন। কোনো পূর্বঘোষিত কর্মসূচি বা তাৎক্ষণিক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ছাড়াই অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
প্রকাশ্যে আসার পর জানানো হয়, এতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। তবে এই আকস্মিক সফরের মূল উদ্দেশ্য ও সময় নিয়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সমীকরণ সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই গোপন সফরের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ ও উদ্দেশ্য কাজ করেছে। প্রথমত, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন নিরসন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার প্রায় দেড় সপ্তাহ আগে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। এরপর নেতানিয়াহুর কার্যালয় বিষয়টি প্রকাশ্যে অস্বীকার করলে দুই দেশের সুসম্পর্কে ফাটল ধরে এবং একটি সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সাবেক ইসরায়েলি কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবেদনশীল এই বিরোধ মিটিয়ে নিতে এবং ওই বর্ণনার বিরুদ্ধে আমিরাতের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে অস্বীকৃতি আদায়ের অনুরোধ করতেই নেতানিয়াহু বিন জায়েদের সঙ্গে সরাসরি এই সাক্ষাৎ করেন।
দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আসন্ন নির্বাচন। ২৭শে অক্টোবর ইসরায়েলের নির্বাচন নির্ধারিত থাকায় এবং ৭ই অক্টোবরের হামলাজনিত নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় নিয়ে দেশের ভেতর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে নেতানিয়াহু প্রচারণায় ব্যাকফুটে রয়েছেন। এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী আরব নেতার সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করে তিনি নিজ দেশের ভোটারদের দেখাতে চেয়েছেন যে, যুদ্ধের পরও ইসরায়েল আঞ্চলিকভাবে বিচ্ছিন্ন নয় এবং আরব নেতাদের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক এখনো অটুট রয়েছে। এমনকি সফরটি গোপন রাখার কথা থাকলেও কূটনৈতিক তথ্য ফাঁসের পেছনে রাজনৈতিক কৌশল থাকতে পারে, যা ইসরায়েলি রাজনীতিতে নেতানিয়াহুকে বাড়তি সুবিধা এনে দেবে।
তৃতীয়ত, ইরানকে কেন্দ্র করে কৌশলগত আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশ। রাজনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি বৈঠকে ইরান পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে। তেহরানের সঙ্গে নতুন কোনো সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূমিকা কী হবে এবং তাদের অবস্থান সমন্বয় করার কৌশল হিসেবে আমিরাতের সঙ্গে এই যোগাযোগ ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আমিরাত ইরানের সঙ্গে নিজস্ব কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে সংঘাত এড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে, তবুও ইরানের বিরুদ্ধে কৌশল তৈরিতে আবু ধাবির সমর্থন ও পরামর্শ চায় তেল আবিব।
সব মিলিয়ে, অতীত সম্পর্কের ফাটল মেরামত করা এবং ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ মেলাতেই নেতানিয়াহুর এই ঝটিকা ও গোপন আমিরাত সফর।




