পা হারানো রিপনের শেষ সম্বলও নিয়ে গেল চোর, পরিবার নিয়ে পথে বসার উপক্রম

‘২০১৬ সালে এক দুর্ঘটনায় আমি ডান পা হারাই। এ খবর শুনে হাসপাতালে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় আমার বাবারও ডান পা ভেঙে যায়। পরিবারের দুইজন উপার্জনক্ষম মানুষ একসঙ্গে পা হারানোর পরও থেমে যাইনি। বিকাশের দোকান করে পরিবার নিয়ে মোটামুটি ভালোই চলছিল। তবে এবার চুরিতে হারিয়েছে আমার সব।
সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকে নগদ সাড়ে ৩ লাখ টাকা ও পাঁচটি মোবাইল ফোন চোরে নিয়ে গেছে। এখন আমি কীভাবে চলব, কে আমাকে সহযোগিতা করবে? পরিবারের ছয়জন মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে।’—কথাগুলো বলছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের ছলিমনগর গ্রামের আরফান হোসেনের ছেলে রিপন হোসেন।
জানা যায়, ২০১৬ সালে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গোড়াই এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ডান পা হারান রিপন। ছেলের দুর্ঘটনার খবর শুনে কুমুদিনী হাসপাতালে যাওয়ার পথে দেওহাটা এলাকায় দুর্ঘটনায় পড়ে একইভাবে ডান পা হারান বাবা আরফান হোসেন।
অভাবের সংসার টিকিয়ে রাখতে চার বছর আগে সঞ্চয়ের টাকায় ছলিমনগর বাড়ির পাশেই বিকাশের আর্থিক লেনদেনের ব্যবসা শুরু করেন রিপন। সেই ব্যবসার আয়েই চলছিল ছয় সদস্যের পরিবার। গত ২৪ জুন গভীর রাতে সিঁধ কেটে বাড়ি থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা ও ব্যবসার পাঁচটি মোবাইল ফোন চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়ে পরিবারটি।
স্থানীয় বাসিন্দা আলতাফ মাহমুদ বলেন:
“২০১৬ সালে পরিবারের দুইজন মানুষ দুর্ঘটনায় পা হারান। পা হারিয়ে রিপন থেমে থাকেননি। আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় কয়েকজনের সহযোগিতায় বিকাশের দোকান করে মোটামুটি ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ গত ২৪ জুন তার বাড়ি থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা ও পাঁচটি ফোন চুরি হয়ে যায়। এই টাকা চুরি হওয়ার পর তিনি অসহায় জীবন-যাপন করছেন।”
রিপনের বাবা আরফান হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “ছয়জন সদস্য নিয়ে আমাদের পরিবার। বাড়ির ছয় শতাংশ জমি ছাড়া আমাদের আর কিছু নাই। ছেলে আমার কত কষ্ট করে দোকানটা দাঁড় করায়। এই টাকাই আমার ছেলের শেষ সম্বল ছিল। এখন আমাদের চলা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
রিপন হোসেন জানান, দুর্ঘটনার আগে তিনি একটি গার্মেন্টসে অপারেটর হিসেবে চাকরি করতেন। পা হারানোর পর দুই বছর ঘরে বসে থাকার পর মানুষের সহযোগিতায় ব্যবসা শুরু করেন।
তিনি বলেন:
“এক পা নিয়েও হাল ছাড়িনি। স্বপ্ন ছিল পরিবারকে নিয়ে সৎভাবে বেঁচে থাকার। কিন্তু ব্যবসার মূলধন হারিয়ে এখন বন্ধ হয়ে গেছে জীবিকার একমাত্র পথ। চোরেরা আমার চার বছরের সঞ্চয় এক রাতেই শেষ করে দিয়েছে। দেশ ও দেশের বাইরের সব ভাই-বোনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, আপনারা মানবতার দিক দিয়ে এগিয়ে আসুন।”
এ ঘটনায় তিনি ইতিমধ্যে মির্জাপুর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, “আমাদের সহযোগিতা একটাই, সেটা হলো ভাতা। বাবা-ছেলে দুইজনই ভাতা পায়। আপাতত এই অর্থবছরে কোনো সহযোগিতা নাই। সামনে যদি কোনো বরাদ্দ আসে তাহলে একটি আর্থিক অনুদান দেওয়া যাবে।”
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, চুরির ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। চুরির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে টাকা ও মোবাইল ফোন উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে।



