শেখ হাসিনার নির্দেশেই শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড

মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হামলার ঘটনাটি পদ্ধতিগত অপরাধ। এটি ছিল ব্যাপক ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড।

এ ঘটনায় সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি রয়েছে। ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত। যখন ব্লগারদের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ করছিলেন, ঠিক তখনই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এই সংগঠনটিকে নিঃশেষ করে দিতে নানা পরিকল্পনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এমন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। হেফাজতের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

রোববার দাখিল করা ওই মামলার খসড়া তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে জানা যায়, হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ওই দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিরপরাধ আলেম ও সাধারণ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। খসড়া তদন্তে ৬১ জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে হেফাজতের কর্মীদের অসংখ্য লাশ দাফন করা হয়। এতে বলা হয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই চালানো হয় এই নারকীয় তাণ্ডব ও হত্যাকাণ্ড। তিনি ছিলেন এ ঘটনার মাস্টারমাইন্ড।

সেদিন শেখ হাসিনা হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাচ্ছিল্য করে বলছিলেন-‘শরীরে রং মেখে এসেছিল হেফাজতের লোকজন।’ তার কারণেই নিহতদের তথ্য তখন গণমাধ্যমে সামনে আসেনি। এরপর বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর নিপীড়ন, নজরদারি এবং সরকারপন্থি মিডিয়ায় নেতিবাচক প্রচারণার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে দমন-پیড়ন শুরু করে সরকার।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম রোববার সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বলেন, ৫ মে শাপলা চত্বরে যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড হয়েছিল সেই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত করেছে। তদন্ত শেষে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটা খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন তারা দাখিল করেছেন। সেই প্রতিবেদনটি এখন চিফ প্রসিকিউটর পর্যালোচনা করবেন।

তিনি বলেন, খসড়া তদন্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার নাম এসেছে। এছাড়া তৎকালীন পুলিশপ্রধান, বিজিবিপ্রধানসহ কয়েকজনের নাম খসড়া তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এগুলো তারা যাচাই-বাছাই করে দেখবেন। খসড়া তদন্ত প্রতিবেদনে আর কাকে কাকে আসামি করা হয়েছে-সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘যেহেতু এটা খসড়া, চূড়ান্ত প্রতিবেদন যেহেতু আমরা রিসিভ (পাইনি) করিনি, আসামিদের তালিকা আমরা প্রকাশ করতে চাইছি না বা পারছি না।’ চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা নিহত প্রায় ৬১ জনের তালিকা পেয়েছিলাম। ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তবে আমাদের তালিকা ৬১ জনের।

এদিন সকালে হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির আব্দুল হামিদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে আসে। প্রতিনিধিদলে যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা মামুনুল হক, মুফতি হারুন ইজহার, মুফতি মীর ইদ্রিসসহ শীর্ষ নেতারা ছিলেন। মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রসিকিউশনের আইনজীবীদলের সঙ্গে তারা মতবিনিময় করেন।

এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, হেফাজত নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। কোনো দোষী যাতে বাদ না পড়ে যায়, সেজন্য আমরা সতর্কতা অবলম্বন করছি। ২১ জুলাই ট্রাইব্যুনাল খোলার দিন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানান হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক। তিনি বলেন, খসড়া রিপোর্ট আমাদের অভিযোগ ও প্রত্যাশার কাছাকাছিই আছে। আমরা যেটুকু দেখেছি, কিছু টুকটাক কারেকশন আছে। আমরা পর্যালোচনা করে দু-একদিনের মধ্যেই তা জানাব। শাপলা চত্বরের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে এই হেফাজত নেতা বলেন, প্রায় ৬১ জনের তালিকা আমরা পেয়েছিলাম।

কিন্তু আমরা ৫৮ জনকে আইডেন্টিফাই করতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের তালিকা হচ্ছে ৬১ জনের। আমরা আগাগোড়াই বলেছি, এখানে অনেক মিসিং আছে। ডেডবডি গুম করার অপচেষ্টা হয়েছে। শুধু মাদ্রাসার ছাত্র নয়; শ্রমিক, ট্রাক ড্রাইভার, বুয়েটের ছাত্র ও রাজনৈতিক দলের কর্মীও রয়েছেন।

শাপলা চত্বরের ঘটনাটিকে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত ‘সবচেয়ে উপযুক্ত ঘটনা’ হিসাবে বর্ণনা করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এটি অবশ্যই একটি সিস্টেম্যাটিক অফেন্স, ওয়াইড স্প্রেড এবং টার্গেটেড কিলিং। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে হেফাজতে ইসলামের মতো একটি সংগঠনকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল।

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সব জায়গায় আলেম-ওলামাদের ওপর নৃশংস আক্রমণ করা হয় এবং রাষ্ট্রের সব অরগানকে এটার বিরুদ্ধে নিয়োজিত করা হয়। পুলিশের বিরুদ্ধে পুলিশের তদন্ত করা নিয়ে ওঠা এক প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, আইন অনুযায়ী ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব পুলিশেরই। আমরা কে পুলিশ বা কে সাংবাদিক, সেটা দেখে তদন্ত করি না, আমরা অপরাধী দেখে তদন্ত করি। এই মামলায় অনেক পুলিশই আসামি হবেন। কাজেই পুলিশের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই। তদন্ত করতে গিয়ে কোনো ধরনের চাপের শিকার হয়েছেন কিনা-এমন প্রশ্নে তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা শহিদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, এখানে কাউকে বাদ দেওয়া বা কাউকে ঢোকানোর কোনো ধরনের চাপ আমাদের ওপর ছিল না।

শুরু থেকে প্রসিকিউশন টিম আমাদের সঙ্গে থাকে এবং উনারাও সার্বক্ষণিকভাবে শুরু থেকে ছিলেন। প্রত্যেকটা বিষয়ে উনাদের গাইডেন্স ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১০ আগস্ট তারিখ ধার্য রয়েছে।

शाहबाগের আন্দোলনের বিপরীতে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম। ওই সমাবেশ ঘিরে মতিঝিল এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরে ওই রাতে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের মতিঝিল থেকে সরানো হয়।

মামলার আসামির তালিকায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ আরও অনেকের নাম এসেছে।

এই মামলায় কারাগারে আছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, র‌্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম ও আবদুল জলিল মণ্ডল এবং একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির।

এছাড়া চলতি বছরের ১৪ মে এই মামলায় সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রূপাকেও গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

Related Articles

Back to top button