শাহজালাল (রহ.) মাজারে ৫০০ খাদেম নিয়ে গড়ে তুলেছে অপরাধ নেটওয়ার্ক

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০০ খাদেমের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে দান-অনুদান আত্মসাৎ, মানতের পশু ও অন্যান্য ধর্মীয় সামগ্রী নিয়ে বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং নানা অনিয়মের মাধ্যমে শক্তিশালী অপরাধ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে—এমন অভিযোগ উঠে এসেছে। জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক নজরদারি ও অনুসন্ধানে মাজারের দান ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়মের ইঙ্গিত মিলেছে, যা ঘিরে শুরু হয়েছে তদন্ত।

সম্প্রতি জেলা প্রশাসন দানবাক্স সিলগালা করে সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে তা খোলার পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর চিত্র; মাত্র ২৫ দিনেই মেলে ৬৪ লাখ টাকারও বেশি নগদ, সঙ্গে ১২ দেশের মুদ্রা, স্বর্ণালংকার ও ৬৫টি ছাগল। মাজার জিম্মি করে রাখা এই সিন্ডিকেটের অন্ধকার সাম্রাজ্য উন্মোচিত হয়েছে যুগান্তরের অনুসন্ধানে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম জানান, মাজারে দীর্ঘদিন ধরে টাকা-পয়সার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব রাখার নিয়ম ছিল না। প্রায় ৭০০ বছর ধরে চলা মাজারের দানবাক্সগুলোতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি না থাকায় দানের অর্থ সরাসরি বস্তায় ভরে মাজারের প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। এ নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হলে ১৮ জুন সিলেটের জেলা প্রশাসন মাজারের তিনটি ডেক ও চারটি দানবাক্স সিলগালা করে দেয়।

২২ জুন সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে প্রথমবার বাক্স খোলার পর মাত্র ৪ দিনের সংগ্রহ দাঁড়ায় নগদ ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। এরপর ১১ জুলাই পুনরায় অর্থ গণনা করে পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। ২৫ দিনে মোট ৬৪ লাখ টাকারও বেশি নগদের পাশাপাশি ১২টি দেশের মুদ্রা, স্বর্ণালংকার ও ৬৫টি মানতের ছাগল পাওয়া যায়।

সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম জানান, প্রথমবার দানের টাকা গোনার সময় হয়তো ৪০- can৪৫ ভাগ টাকা পাওয়া গেছে এবং দ্বিতীয়বার ২০-২৫ ভাগ টাকা পাওয়া গেছে। বাকি অর্থ মাজারের লোকজন নগদ হাতে হাতে নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। বিশেষ করে কবরস্থানের পাশের ঝরনা এলাকা থেকে ভক্তদের বলা হতো, “আপনারা যদি মাজারকে দিতে চান তাহলে আমাদের কাছে দেন, আর যদি সরকারকে দিতে চান তাহলে এই বক্সের মধ্যে ফেলেন।”

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে:

  • মহিলা ইবাদতখানা বন্ধ: দানবাক্সে টাকা কম দেখাতে মাজারের কেরানি সামুন মাহমুদ খানের ইশারায় মহিলা ইবাদতখানা বন্ধ রাখা হয়েছে যাতে মহিলারা দানবাক্সে টাকা ফেলতে না পারেন।

  • একই পশু বারবার বিক্রি: মানতের পশু কেরানি সামুনের গোয়ালঘর থেকে বিক্রি করা হয়। আগে থেকে দান করা একটি গরু বা ছাগলই সুকৌশলে নতুন ভক্তদের কাছে সাতবার পর্যন্ত বিক্রি করা হয়।

  • গিলাফ ও গোলাপজল বাণিজ্য: ভক্তরা বিদায় নেওয়ার পরপরই মাজারের গিলাফ ও গোলাপজল সরিয়ে ফেলা হয় এবং তা পুনরায় সামনের দোকানে নতুন করে চড়া দামে বিক্রি করা হয়।

মাজারে প্রতিদিন ফজর থেকে পরবর্তী ফজর পর্যন্ত নির্দিষ্ট একজন খাদেমের ‘বারি’ বা ডিউটি থাকে, যার দৈনিক আয় ৪-৫ লাখ টাকা এবং ছুটির দিনে তা ১০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এই আয়ের সিংহভাগ বারি পাওয়া খাদেম ও সিন্ডিকেটের মূল হোতারা ভাগ করে নেন।

কেরানি সামুন মাহমুদ খান ও খোকন (ওরফে বকরি খোকন)-এর অধীনে মনি, কুতুব, বাবুল ও মিলন নামের চার অপরাধী মাজারের পকেটমার, ছিনতাইকারী ও জুতাচোর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। মাজার প্রাঙ্গণে কোনো সাধারণ মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে হেড বাবুর্চি সোহেল ও ফয়েজের নেতৃত্বে তাকে ‘চোর’ সাব্যস্ত করে অমানুষিক নির্যাতন করা হয় এবং পরে পুলিশ থেকে বাঁচানোর নামে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া মানতের পশু জবাই ও শিন্নি পাকের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা ও মাংস জোরপূর্বক কেটে রাখা হয়।

মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান জানান, মাজারের সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে সিসি ক্যামেরা লাগানো বা দানবাক্স সিলগালা করা অনভিপ্রেত। তবে মাজারের নিজস্ব চৌকিদাররা পকেটমার ও প্রতারকদের সব সময় প্রতিহত করে আসছেন।

সিলেটের নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন,

“আমি জেলা প্রশাসক হিসেবে রোববার (১৩ জুলাই) যোগদান করেছি। মাজারের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে এরই মধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।”

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ জানান, বেশ কিছুদিন ধরে দুদকে কমিশন (চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার) না থাকায় আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা যায়নি। তবে আন-অফিশিয়াল তথ্য-упат্ত সংগ্রহ করা হয়েছে, কমিশন গঠনের পর অনুমতি সাপেক্ষে অনুসন্ধান শুরু হবে।

Related Articles

Back to top button