জুলাই আন্দোলনে আহত সাংবাদিক রায়হান ব্যাংককে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ চলাকালে নীলফামারীর চৌরঙ্গী মোড়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের বর্বর হামলার শিকার হন অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘স্বদেশ বার্তা টুয়েন্টিফোর ডট কম’-এর সাংবাদিক রায়হান আলী। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে দেশে ও বিদেশে চিকিৎসার পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি; বর্তমানে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে হাসপাতালের শয্যায় প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন এই তরুণ সাংবাদিক।
রায়হান আলী নীলফামারী সদরের পঞ্চপুকুর ইউনিয়নের উত্তরা শশী পুরানা কাছারি পাড়া গ্রামের কৃষক আলী হোসেনের ছেলে। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী দীপ্ত টিভির নীলফামারী প্রতিনিধি মামুনুর রশীদ মিঠু এবং আরসিটিভির ইব্রাহিম সুজন জানান, ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ অতর্কিত টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগোচ্ছিল। রায়হান বিক্ষোভের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করছিলেন। তার হাতে ক্যামেরা দেখে পুলিশ বেপরোয়া হয়ে পেছন থেকে লাঠিচার্জ ও অতর্কিত হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।
রংপুর মেডিকেলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরে না আসায় রায়হানকে ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সরকারের সহায়তায় ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর তাকে থাইল্যান্ডের ব্যাংককস্থ ভেজথানি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
থাইল্যান্ডের এই হাসপাতালে এ পর্যন্ত তার শরীরে ১৮টিরও বেশি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে এবং সামনে আরও কয়েক দফা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও তার শরীর এখনো পুরোপুরি সাড়া দিচ্ছে না; প্রতিটি দিন কাটছে তীব্র যন্ত্রণা আর অনিশ্চয়তায়।
ব্যাংককের হাসপাতাল থেকে রায়হান আলী মুঠোফোনে জানান, “পুলিশের বেধরক মারধরে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। দেশে চিকিৎসার জন্য পরিবারের ভিটেমাটি বাদে সবকিছু এবং বাবার উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম মুদি দোকানটি ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এখন আমি ছাড়া পরিবারে আয় করার কেউ নেই। চার বছর বয়সী আমার একটা বাচ্চা আছে। আমার বৃদ্ধ মা-বাবা দেশে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন। আমি সুস্থ হয়ে বাঁচতে চাই। সরকার যদি আমার বাকি চিকিৎসায় পাশে দাঁড়ায় এবং আমার পরিবারকে একটু আর্থিক সহায়তা করে, তবেই তারা বেঁচে থাকতে পারবে।”
রায়হানের বৃদ্ধ বাবা আলী হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “মানুষের কথা বলতে গিয়ে আজ আমার ছেলে নিজের জীবনটাই হারানোর পথে। যা কিছু ছিল সব চিকিৎসার পেছনে শেষ হয়ে গেছে। এখন যে তিনবেলা ঠিকমতো খাব, সেটারও উপায় নাই। দেশবাসীর মানবিক সহযোগিতা এবং সরকারের জোরালো সহায়তা ছাড়া আমাদের আর কোনো ভরসা নাই।”
পঞ্চপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ ওয়াহেদুজ্জামান বলেন, “একদিকে ছেলের বিদেশের মাটিতে যন্ত্রণাদায়ক দিন কাটছে, অন্যদিকে দেশে তার চার বছর বয়সী শিশুপুত্র লাবিব ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের আহাজারিতে চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে। তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
এ বিষয়ে নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুবাশ্বিরা আমাতুল্লাহ বলেন, “আহত সাংবাদিক রায়হানের পরিবারের খোঁজ নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সর্বোচ্চ সহায়তা করার চেষ্টা করা হবে।”



