‘ফল খাওয়ার জন্য টাকা পাঠাতে চেয়েছিল, কিন্তু ছেলেটা আগুনে পুড়ে মরে গেলো’

‘শাহিন কল দিছিল, বলছিলাম বাবারে আমি কিছু ফল কিনে খাই জানিস তো তুই, আমাকে কিছু টাকা পাঠা। শাহিন বললো “মা ১২ তারিখে টাকা পাঠাবোনি, ফল কিনে খাইও”। কিন্তু আমার ছেলেটা আগুনে পুড়ে মরে গেলো। আমার বুকের ধনটা আমাকে রেখে চলে গেলো। আমি তো একা হয়ে গেলাম, আমি এখন বাঁচবো কী করে।’ এভাবে কান্না আর আহাজারি করে কথাগুলো বলছিলেন সৌদি আরবের রিয়াদের সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে নিহত শাহিনের মা নার্গিস বেগম।

শনিবার সকালে নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকায় নিহত শাহিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শাহিনের নিথর দেহের অপেক্ষার প্রহর গুনছেন মা নার্গিস বেগম। বারবার কান্না আর শোকে ভেঙে পড়ছেন তিনি। আত্মীয়স্বজনসহ প্রতিবেশীরাও অপেক্ষা করছেন শাহিনের মরদেহ এক নজর দেখার জন্য।

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় এ বছরের এপ্রিল মাসে সাড়ে ৫ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার বাসিন্দা শাহিন। রেখে যান স্ত্রী, ৬ বছরের ছেলেসন্তান, ৮ মাস বয়সী কন্যা এবং ষাটোর্ধ্ব মাকে। বিদেশে পাড়ি জমানোর পাঁচ মাসের মাথায় শাহিনকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ তার পরিবার এবং স্বজনরা।

শাহিনের মামি নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, শাহিনের বয়স যখন চার বছর তখন তার বাবা মারা যায়। ছোট থেকেই অনেক কষ্ট করে শাহিন বড় হয়েছে। বিদেশে গিয়ে ভালো টাকা-পয়সা হবে, এ আশায় বিয়ের পর সাড়ে ৫ লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে গেল ছেলেটা। মারা যাওয়ার তিন দিন আগে প্রথম টাকা পাঠাইতে চাইছিলো। ৩২ হাজার টাকা দিতে চাইছিলো ১২ তারিখে, বলছিলো ২০ হাজার টাকা দিয়ে কিস্তি পরিশোধ করতে এবং বাকি টাকা সংসারের কেনাকাটা করার জন্য। কিন্তু ছেলেটা আগুনে পুড়ে মারা গেল।

শাহিনের মামা আব্দুস সালাম বলেন, ছোট থেকেই আমার ভাগনে অনেক পরিশ্রমী ছিল। আমার ভগ্নিপতি মারা যাওয়ার পর আমার বোন শাহিনকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করে। ছেলেটা ধার-দেনা করে বিদেশে গেলো। টাকা পাঠানো শুরু করবে তাতেই মারা গেলো। পরিবারটা একা হয়ে গেলো। সরকারের কাছে পরিবারটির দিকে সুনজর দেওয়ার দাবি জানাই।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, মরদেহগুলো বিনা খরচে পরিবারের মাঝে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারগুলোকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

প্রসঙ্গত, সৌদি আরবের রিয়াদের সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে গত ৯ আগস্ট ১৬ বাংলাদেশি প্রবাসী মৃত্যুবরণ করেন। এর মধ্যে ১২ জনের বাড়িই নওগাঁ জেলায়। গত ২৭ আগস্ট ৯ জনের মরদেহ দেশে আসে। এরপর আজ বাকি ৭ জনের মরদেহ দেশে এসে পৌঁছেছে। ৭ জনের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। নওগাঁর পাঁচজন হলেন—নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, একই উপজেলার মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামানিকের ছেলে মিনহাজ প্রামানিক, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের আজহার আলীর ছেলে সাগর আলী।

Related Articles

Back to top button