ধউর ভূমি অফিসে জাল দলিল ও অবৈধ নামজারির মাধ্যমে জমি দখলের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর উত্তরার ধউর ও ভাটুলিয়া মৌজায় যুবক হাউজিং রিয়েল এস্টেটের ক্রয়কৃত জমি জালিয়াতি করে হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পুরোনো দলিলের তথ্য পরিবর্তন (টেম্পারিং), ভুয়া দলিল তৈরি, একতরফা আদালতের ডিক্রি এবং অবৈধভাবে নামজারি করার মাধ্যমে এই জালিয়াতি চলছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গোলাম রাসেল সৈয়াল ও মো. কবিরসহ একটি চক্র জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধউর ভূমি অফিস এবং মিরপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী পক্ষ।

অভিযোগকারী পক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সিএস রেকর্ডীয় মালিকদের কাছ থেকে ১৯৫০ সালের ২ অক্টোবর ৪৬৪৭ ও ৪৩৪৮ নম্বর এবং ১৯৬০ সালের ২৬ অক্টোবর ১৩৩৮৬, ১৩৩৮৭ ও ১৩৩৮৮ নম্বর দলিলের মাধ্যমে ধউর ও ভাটুলিয়া মৌজায় মোট ৩১৮ শতাংশ জমি ক্রয় করেন জব্বার আলী গং। পরবর্তীতে তাঁরা এসএ ও আরএস রেকর্ড করিয়ে জমি ভোগদখলে ছিলেন।

এরপর ১৯৭৮ সালের ৭ ডিসেম্বর ৪০৭৪, ৪০৭৫, ৪০৭৬, ৪০৭৭, ৪০৯২ ও ৪০৯৪ নম্বর ছয়টি দলিলের মাধ্যমে আবুল কাশেম, মুল্লুক চান, জানু ও করম আলী ওই সম্পত্তি ক্রয় করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ও ২৪ ডিসেম্বরের ৪৫৪ ও ৯২১ নম্বর দলিলের মাধ্যমে জানু মিয়া ও করম আলীর অংশটুকু হযরত আলী গং ক্রয় করেন।

পরবর্তীতে আবুল কাশেম ও হযরত আলী গং ২০০২ সালের ১১ জুলাই ও ২৬ আগস্ট মোট ২১২ শতাংশ জমি যুবক হাউজিংয়ের কাছে বিক্রি করেন। যুবক হাউজিং বৈধভাবে মালিকানা অর্জনের পর সেখানে রাস্তা নির্মাণ করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে প্লট আকারে জমি বিক্রি করে। ক্রেতাদের অনেকে নামজারি সম্পন্ন করে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী জমি ভোগদখল করছেন। এছাড়া যুবক হাউজিং বিভিন্ন মালিকের কাছ থেকে আরও প্রায় ৩৫ বিঘা জমি কিনে প্লট আকারে বিক্রি করেছে।

অভিযোগে বলা হয়, ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি মো. কবির ২০০৮ সালের ৮৩৫, ৮৩৬, ৮৩৭, ৮৩৮ ও ৮৩৯ নম্বর—এই পাঁচটি দলিলের তথ্য পরিবর্তন (টেম্পারিং) করে যুবক হাউজিংয়ের কেনা সম্পত্তিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে ইস্ট ওয়েস্টের মালিক মুস্তাক হোসেন ও মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে কমিশনভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে ওই সম্পত্তি বিক্রির ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সংক্রান্ত ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বরের ৪৩১৬ নম্বর দলিলের বিষয়টিও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে গোলাম রাসেল সৈয়াল ১৯৯৭ সালের ১০ মার্চের ৩৩৮৮ নম্বর দলিলের ভিত্তিতে নিজের মায়ের নামে যুবক হাউজিংয়ের সম্পত্তির নামজারি ও খারিজ করানোর উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৭ এপ্রিল ৩২৩৮ নম্বর সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে মুস্তাক হোসেনের কাছে ১৬.৫০ শতাংশ জমি বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রের দলিল তৈরি, অর্থায়ন এবং নেপথ্যে সহযোগিতাকারীদের চিহ্নিত করে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

ধউর ভূমি অফিসের নায়েব ও তাঁর সহযোগী এবং মিরপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিতর্কিত ও ভুয়া দলিলের ভিত্তিতে নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে এসিল্যান্ড কার্যালয়ের কর্মকর্তা মুরাদ, অফিস সহায়ক সজীব এবং মো. কবির ও গোলাম রাসেল সৈয়ালের নাম এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, মুস্তাক হোসেনের নামে ভুয়া দলিলের ভিত্তিতে নামজারি ও খারিজ করানো হয়েছে। এছাড়া মো. কবিরের বিরুদ্ধে ঢাকার জমির ক্ষেত্রে কালামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য ব্যবহার করে ‘বেবি’ নামের এক ব্যক্তির নামে যুবক হাউজিংয়ের জমি নামজারি করানোর অভিযোগ রয়েছে।

পুরোনো তারিখের দলিল ব্যবহার করে প্লটের প্রকৃত মালিকদের না জানিয়ে আদালতে মামলা করা এবং একতরফা ডিক্রি নেওয়ারও অভিযোগ তুলেছে ভুক্তভোগী পক্ষ। এসব ডিক্রির ভিত্তিতে নামজারি সম্পন্ন করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে জমি বিক্রির চেষ্টা চলছে, যার ফলে প্রকৃত মালিক ও প্লট ক্রেতারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা অন্যান্য দলিলের মধ্যে রয়েছে—২ আগস্ট ১৯৭৫ সালের ১৭৩৭৭ নম্বর, ৮ মার্চ ১৯৬৯ সালের ২৭৫৮ নম্বর, ১০ মার্চ ১৯৯৭ সালের ৩৩৮৮ নম্বর এবং ১৫ নভেম্বর ১৯৭৩ সালের ২৭৪৯২ নম্বর দলিল। এসব দলিলের প্রকৃত অস্তিত্ব, বালাম বই, নামজারি ও খারিজের নথি এবং আদালতের মামলার কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি চক্রের এমন কর্মকাণ্ডে বৈধ প্লট ক্রেতা ও জমির মালিকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন। তাই ভূমি মন্ত্রণালয়, ঢাকা জেলা প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিসের নথিপত্র যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

Related Articles

Back to top button