আমার ছেলে আয়ানের বয়স তখন ৩ বছর ১১ মাস

নিজস্ব প্রতিবেদক :আমার ছেলে আয়ানের বয়স তখন ৩ বছর ১১ মাস। তাইওয়ানের প্রি-স্কুলের ছাত্র। স্কুল থেকে এ সপ্তাহের বই দিয়েছে। এটি নিয়মিত ঘটনা। প্রতি শুক্রবার স্কুল থেকে একটি করে বই দেওয়া হয়। সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোয় (শনি-রোববার) বইটি যেন পড়ানো হয়। অনেকটা বলা যায় মা–বাবার জন্য বাড়ির কাজ। আমার স্ত্রী তৃশা বইটি হাতে নিয়ে নড়েচড়ে দেখল। সে নিজেও বাংলাদেশের একটি পাবলিক ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক। বইটি কিছুক্ষণ উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে ভ্রু কুচকে বলল,
এ ধরনের বই তো আমাদের দেশে হাইস্কুলের ছেলেমেয়েদের পড়ানো হয়।
স্কুল থেকে যেহেতু দিয়েছে, পড়াতেই হবে। তাই আয়ানকে প্রথমে জিজ্ঞাসা করল,
চাঁদ আলো কোথায় থেকে পায়, জানো?
আয়ান ঝটপট উত্তর দিয়ে দিলো,
ওর (চাঁদ) তো লাইট (আলো) নেই। ও তো সান থেকে লাইট পায়!
তৃশা টাস্কি খেয়ে জিজ্ঞাসা করল,
তোমাকে এটা কে বলেছে?
আয়ানের ঝটপট উত্তর,
স্কুলে টিচার শিখিয়েছে! মুনের তো লাইট নেই। সান থেকে লাইট মুনে আসে।
আয়ানের উত্তর শোনে আমরা দুজনেই অবাক হয়ে গেলাম। তার মানে, স্কুলে ইতিমধ্যে পড়ানো হয়ে গিয়েছে!! আমি বইটি হাতে নিলাম। তারপর সব কটি পাতা চায়নিজ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করলাম। দেখলাম, কী নেই এখানে! চাঁদে আলো কোথায় থেকে আসে, চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, জোয়ার ভাটা থেকে শুরু করে রকেট, মানুষের চাঁদে অভিযান পর্যন্ত আছে। ছবি আর গল্পের মাধ্যমে সবকিছু চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। শিশুরাও সহজে গ্রহণ করতে পারবে! কি চমৎকার শিক্ষা! আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের দেশের হাইস্কুলে পড়ুয়া অনেক ছেলেমেয়েও এ বইয়ের অনেক কিছুর উত্তর দিতে পারবে না। ভিয়েতনামের প্রতিষ্ঠাতা হো চি মিনের উন্নয়নের সঠিক পথ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল। শিক্ষা সম্পর্কে তার একটি উক্তি অনলাইনে পড়েছিলাম, ‘১০ বছরের উপকারের জন্য, আমাদের অবশ্যই গাছ লাগাতে হবে। শত বছরের কল্যাণের জন্য, আমাদের অবশ্যই জনগণকে সুশিক্ষিত করতে হবে।’ আসলেই তা–ই করা হচ্ছে। পাঁচ ধাপের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভিয়েতনাম ধারুন সফলতা পাচ্ছে। ফলে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই আন্তর্জাতিক পত্রিকায় খবরের শিরোনাম হয়। কিছুদিন আগে একটি ব্রিটিশ পত্রিকার শিরোনাম ছিল এ রকম, ‘ভিয়েতনামের শিক্ষাব্যবস্থা এত ভালো কেন?’ শিক্ষা একটি জাতির কি পরিবর্তন আনতে পারে, ভিয়েতনাম তার একটি উদাহরণ। শুধু খবরের পাতায় পড়েছি বলে লিখছি না। আমার ল্যাবে দুটো ভিয়েতনামিজ মেয়ে পিএচডি করছেন। ওদের দেখে সহজেই বুঝতে পারি, ওদের শিক্ষাব্যবস্থার আসল চিত্র। অথচ মাত্র এক যুগ আগেও ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক অবস্থা আমাদের বাংলাদেশের মতোই ছিল। চরম দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর দেখা মিলত দেশের আনাচকানাচে। কৃষিকাজ, টেক্সটাইল আর পর্যটন। এই ছিল আয়ের পথ। এখন দিন বদলেছে। ছেলেমেয়েরা সমভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা রপ্তানি করছে তৈরি পোশাক থেকে টেকনোলজিক্যাল প্রোডাক্টস। অচিরেই তারা হতে যাচ্ছে টেকনোলজির নতুন হাব। নতুন শিক্ষিত কর্মক্ষম জনশক্তির হাত তাদের অর্থনীতি তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। এমনকি এই এক দশকেই বাংলাদেশ ছাড়িয়ে গিয়েছে বহুগুণ। এটি বোঝার জন্য দুটো ছোট তথ্য দেই। ভিয়েতনামের বাৎসরিক রপ্তানির পরিমাণ ৩৭১ বিলিয়ন ডলার আর বাংলাদেশের প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার। যেখানে আমরা ২৩ বিলিয়ন রিজার্ভ নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছি, সেখানে ভিয়েতনামের রিজার্ভের পরিমাণ ১০৫ বিলিয়ন ডলার দেশের মুল মেরুদণ্ড বলি আর মস্তিষ্ক বলি, ওটা একমাত্র শিক্ষা আর গবেষণাই। উন্নত দেশগুলো ঠিক এ জায়গাতেই জোর দিচ্ছে। ফলাফলও পাচ্ছে হাতেনাতে। তারা দিনের পর দিন এখানে বিনিয়োগ করছে। তার ফল বিক্রি করছে সারা বিশ্বে। আর আমরা? শিক্ষা খাতে তেমন বিনিয়োগ নেই। গত বছর সংবাদে পড়েছিলাম বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য (২০২২-২৩) সালে উচ্চশিক্ষায় গবেষণা বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। খুবই নগণ্য পরিমাণ একটি বরাদ্দ! অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন একাই ইভিএম কেনার জন্য বাজেট চূড়ান্ত করছিল ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকা! যা বাংলাদেশের সব কটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ বছরের গবেষণা বাজেটের সমান! আই রিপিট, ৫৮ বছরের সমান! যদিও রাজনৈতিক বাস্তবতা কিংবা অর্থনীতিক সমস্যার কারণে ইভিএম কেনার জন্য শেষমেশ এতগুলো টাকা আর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।



