প্রথমেই আসা যাক সংবিধান জিনিসটা কী

নিউজ ডেস্ক :গলি থেকে রাজপথ, চায়ের দোকান থেকে বিদ্যারত্ন পাড়া- সর্বত্রই সংবিধান চর্চা চলছে। প্রথমেই আসা যাক সংবিধান জিনিসটা কী? আইন পন্ডিতর মতে, যেসব নিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সেগুলোকে একত্রে সংবিধান বলে। দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন, A constitution is the way of life that the state has chosen for itself. (অর্থাৎ, সংবিধান হল এমন এক জীবনপদ্ধতি, যা রাষ্ট্র স্বয়ং নিজে বেছে নিয়েছে)। যাই হোক, বাংলাদেশ এখন সংবিধান পুনর্লিখনের প্রেক্ষাপটে উপনীত হয়েছে। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যেখানে সাধারণ জনগণ তাদের ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সুশাসনের দাবি নিয়ে জেগে উঠেছিল। এই ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সরকার কাঠামোর উপর এক প্রকার আস্থাসঙ্কটের জন্ম দেয়। তাই সংবিধান পুনর্লিখনের প্রয়োজনীয়তা এখন তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। এটা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে গণতন্ত্র এবং সমতা প্রতিষ্ঠার তীব্র আকাক্সক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। সংবিধান পুনর্লিখনের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ড. আলী রিয়াজ সংবিধান পুনর্লিখনের প্রয়োজন কেন, সে প্রসঙ্গে বলেন, ‘সংবিধান পুনর্লিখনের কথা বলছি এই কারণে যে, সংবিধান সংশোধনের উপায় নেই। বর্তমান সংবিধান সংশোধনের উপায় সীমিত। কারণ, সংবিধানের এক তৃতীয়াংশ এমনভাবে লেখা যে, তাতে হাতই দেওয়া যাবে না। এর মধ্যে এমন সব বিষয় আছে, যেগুলো না সরালে কোনো কিছুই করতে পারবেন না। এ কারণে পুনর্লিখন শব্দটা আসছে। পুনর্লিখনের পথ হিসেবে গণপরিষদের কথা বলছি। আর কোনো পথ আছে কিনা আমি জানি না।’অধ্যাপক আলী রিয়াজ আরো বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, সংবিধানের পুনর্লিখন করতে হবে। এর বাইরে আপনি প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করতে পারবেন না।’ প্রধান উপদেষ্টা যখন সংবিধান সংস্কারের জন্য ড. শাহদীন মালিককে সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, তখন ড. শাহদীন মালিক প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আইনে সবসময় ভালো কথা লেখা থাকে। উদাহরণস্বরূপ, চুরি করা অপরাধ এবং এতে শাস্তি সাত বছরের জেল; কিন্তু চুরি তো হয়েই যাচ্ছে। আমি মনে করি, এখানে আইনের দোষ খুব কম। দোষ তাদের যারা আইন লঙ্ঘন করছে।
কয়েকদিন পরে ড. শাহদীন মালিক এই পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং তার স্থলাভিষিক্ত হন অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ। ফলে সংবিধান সংস্কার কমিশন কি পুনর্লিখন কমিশনে পরিণত হয়েছে, এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। এখন এই পুনর্লিখন জিনিসটা কী? বিদ্যমান সংবিধান বাতিল করে একটি সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান প্রণয়ন করাই হলো সংবিধান পুনর্লিখন। সাধারণত রাজনৈতিক বিপ্লব, যুদ্ধ, গণ-অভ্যুত্থান বা সরকার কাঠামোর বড় ধরনের পরিবর্তনে সংবিধান পুনর্লিখনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রতিটি দেশ বা জাতির সংবিধান মূলত তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক আকাক্সক্ষার দলিল। কিন্তু বিদ্যমান আইনি কাঠামো জনগণের আকাক্সক্ষা ও চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে জনগণের নতুন চাওয়া-পাওয়ার ভিত্তিতে সংবিধান পুনর্লিখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে এবং সংবিধান পুনর্লিখনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রত্যাশিত নতুন রাজনৈতিক চুক্তিতে উপনীত হয়, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আকাক্সক্ষা ও স্বাধীনতার ধারণাগুলো আরো সুসংহত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সংবিধান পুনর্লিখনের ক্ষেত্রে কী ধরনের ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান পুনর্লিখন একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া, যা সাধারণত বড় ধরনের আর্থিক এবং মানবসম্পদের প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে চালিত হয় এবং কখনও কখনও এটি একটি দেশের পুরো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের জন্য অনেক বছর সময় নেয়। যেমন, ইকুয়েডরে এই প্রক্রিয়াটি এক থেকে দুই বছর ধরে চলে। আনুমানিক ৩-৫ মিলিয়ন ডলারের মতো খরচ হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় এই প্রক্রিয়াটি প্রায় এক বছর ধরে চলে। কেনিয়ায় কয়েক বছর ধরে চলে। এতে খরচ হয়েছিল প্রায় ৫৬ বিলিয়ন কেনিয়ান শিলিং। দক্ষিণ আফ্রিকায় এই প্রক্রিয়াটি প্রায় দুই বছর ধরে চলে। ধারণা করা হয়, এতে প্রচুর অর্থ ব্যায় হয়। ফিলিপাইনে সময় লেগেছিল এক বছরের মতো। নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে গিয়ে প্রাথমিকভাবে যে সময় এবং অর্থের প্রয়োাজন হয়, তা কেবল নতুন আইন এবং বিধিবিধান তৈরি করাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটির বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে তা কার্যকর করার জন্যও বড় ধরনের ব্যয় হয়।



