স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের কোনো সুযোগ নেই : সমাজকল্যাণ মন্ত্রী

এখানে আপনার প্রদান করা খবরটি কোনো বোল্ড (Bold) টেক্সট ছাড়া তুলে ধরা হলো:

স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের কোনো সুযোগ নেই : সমাজকল্যাণ মন্ত্রী

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে জনগণের অধিকার নিয়ে কেউ যাতে ছিনিমিনি খেলতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব সবার।

তিনি বলেন, মনে রাখতে হবে, যারা পালিয়ে গেছে তারা বসে নেই। তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা আশপাশেই আছে। আর যারা মনে করেছিলেন ষড়যন্ত্র করে ২০০৯ সালের মতো ক্ষমতায় চলে যাবেন, তাদেরও অনেক কষ্ট হচ্ছে, কারণ জনগণ তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়েছে।

রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে জেটেব আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

জাহিদ হোসেন বলেন, মনে রাখতে হবে, এই জনআকাঙ্ক্ষা ও জনগণের ঐক্যের মধ্যে ফাটল ধরানোর জন্য কেউ কেউ বিভিন্নভাবে চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জনগণের দল, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর দল।

তিনি বলেন, সকল ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার সংরক্ষণের দলের নাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল।

বিএনপির এই নেতা বলেন, এই দলের অতীত যেমন রয়েছে, তেমনি বর্তমানও রয়েছে। ইনশাআল্লাহ আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের আগামীর বাংলাদেশ হবে একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ— যেখানে সুশাসন থাকবে, অন্যায়, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের কোনো সুযোগ থাকবে না এবং মানুষ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

তিনি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ যদি আমরা বিনির্মাণ করতে পারি, তাহলে সাজ্জাদ বলেন, সেলিম তালুকদার বলেন কিংবা ইঞ্জিনিয়ার আতিক বলেন— আমাদের শত শহীদ, শত গুমের যে যাতনা আমরা বহন করছি, তা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারব। দেশের মানুষ মুক্তি পাবে এবং দেশের মানুষ সেই প্রতিজ্ঞায় এগিয়ে যাবে।

জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জুলাই শহীদ, পঙ্গুত্ববরণকারী ও চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের জন্য একটি অধিদপ্তর করেছে। যেখানে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের স্বার্থ সংরক্ষণ, বিগত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে যারা গুম হয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং সর্বোপরি জুলাই-আগস্টে যারা শহীদ, পঙ্গুত্ববরণকারী ও বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন— তাদের পরিবার ও সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, তাদের কাছ থেকেই সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমাদ আজম খানকে নির্দেশ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী কার্যক্রম চলছে।

তিনি আরও বলেন, আজকে আমরা আমাদের তিনভাইসহ আরও শত শত ভাইকে হারিয়েছি। হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। ইলিয়াস আলীকে দিয়ে শুরু হয়েছিল। এরপর শত শত নেতাকর্মী গুম হয়েছেন, আজকে তারা কোথায় আছেন আমরা জানি না।

জাহিদ হোসেন বলেন, জুলাই শহীদদের অনেকের কবর আমরা খুঁজে পেয়েছি বা তাদের দাফন করার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু যারা গুম হয়েছেন, তারা জীবিত না মৃত— তাদের পরিবার জানে না, আমরাও জানি না।

তিনি বলেন, তাদের সন্তান ও পরিবারের সদস্যরা বলতে পারেন না তাদের স্বজন কোথায়। এই দুর্বিষহ অবস্থা, মনোকষ্ট ও যাতনা একটি পরিবারকে সারাজীবন বহন করতে হবে। শুধু এই প্রজন্ম নয়, পরবর্তী প্রজন্মও এই কষ্ট বহন করবে। যারা এই কষ্টের মধ্যে পড়েননি, তারা বুঝতে পারবেন না এটি কী ধরনের কষ্ট।

তিনি বলেন, আজকে আমাদের চিন্তা করার সময় এসেছে। কেউ কেউ ভেতর থেকে, কেউ বাইরে থেকে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন, হুংকার দিচ্ছেন। বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের কথাও পত্র-পত্রিকায় শোনা যায়।

জাহিদ হোসেন বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, বিগত ১৯ বছর গণতন্ত্রহীন থাকার পর ১২ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, যেখানে মানুষ দীর্ঘদিন পর ভোট দিয়েছে।

তিনি বলেন, ২০০৮ সালেও মানুষ নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারেনি। তখনও প্রকৃত ভোটের প্রতিফলন মানুষ দেখেনি। এবারই প্রথম জনগণের ভোট, জনগণের অংশগ্রহণের ভোট হয়েছে। মানুষ নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে।

তিনি আরও বলেন, মানুষ যাদের দায়িত্ব দিয়েছে, যাদের ওপর আস্থা রেখেছে, সেটি মনে রাখতে হবে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সেই দায়িত্ব পেয়েছে।

জাহিদ হোসেন বলেন, যখনই গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে, গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিংবা দেশ ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তখনই বিএনপি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মার্চে যখন কেউ কেউ পালিয়ে গিয়েছিলেন, কেউ কেউ আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তখন চট্টগ্রাম থেকে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান ‘আই দেন উই’ বলে স্বাধীনতার ঘোষণা ও বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন এবং অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

তিনি বলেন, দেশ যখন অন্ধকার অমানিশার দিকে যাচ্ছিল, তখন জিয়াউর রহমান হাল ধরেছিলেন।

জাহিদ হোসেন বলেন, আমরা তখন কানে শুনেছি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে সেই ঘোষণা। কিন্তু আজ সেই ইতিহাসও মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যখন আবারও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছিল এবং দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন সিপাহী-জনতা আস্থা রেখেছিল সেই মানুষটির ওপর, যিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং যার কোনো পিছুটান ছিল না।

তিনি বলেন, তখন বিএনপি নামের কোনো দল ছিল না। কিন্তু জনগণ ও সিপাহী-জনতার আস্থা ছিল মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রতি। বন্দিদশা থেকে তাকে মুক্ত করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

জাহিদ হোসেন বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন একজন দেশপ্রেমিক মানুষ, যার প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ছিল। তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন। দেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি বলেন, যার কারণে আজ বাংলাদেশকে আধুনিক বাংলাদেশের জনক হিসেবে শহীদ জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়।

তিনি বলেন, এরই ধারাবাহিকতায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সারা দেশ ঘুরে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে দলকে জনগণের দলে পরিণত করেছেন। ১৯৯১ সালের অবাধ নির্বাচনে জনগণের ভালোবাসায় বিএনপি ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

জাহিদ হোসেন বলেন, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরও মানুষ যে দলের প্রতি আস্থা রেখেছিল, সেটি ছিল বিএনপি।

তিনি বলেন, পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালের আন্দোলনের কথা মনে রাখতে হবে। অনেকে মিলে ১৭৪ দিন আন্দোলন ও হরতাল করেছিলেন। কিন্তু বিএনপি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছে।

তিনি বলেন, বিএনপি দলগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু কখনো ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেনি। বিএনপির মধ্যে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল, কোনো স্বৈরাচারী মানসিকতা ছিল না।

জাহিদ হোসেন বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিলেন, তারা ষড়যন্ত্র করে একটি দলকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘদিন ভোটের প্রয়োজন হয়নি।

তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে ভোটার না থাকলেও নির্বাচন হয়ে গেছে। দিনের ভোট রাতে হয়েছে। অথচ তখন এমন একটি শাসন ব্যবস্থা ছিল যে সাগর-রুনি হত্যার বিচার আজও হয়নি, চার্জশিটও দেওয়া হয়নি, ১২০ বারের বেশি মামলার তারিখ পিছিয়েছে।

তিনি বলেন, মানুষের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

জাহিদ হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনেও এমন পরিস্থিতি হয়েছিল যে প্রার্থী পাওয়া যায়নি। এরপর একের পর এক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত রূপ নেয়।

তিনি বলেন, যাদের দুধ-কলা দিয়ে পুষলেন, যাদের লালন করলেন, তারা শেষ পর্যন্ত পাশে থাকতে পারেনি। তারা কোনো সুরক্ষা দিতে পারেনি।

তিনি বলেন, শিক্ষা হলো— জনগণের পাশে না থাকলে, জনগণের ভালোবাসা অর্জন করতে না পারলে, যত প্রশাসন বা বাহিনীর ওপর নির্ভর করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত কাচের ঘরের মতো সব ভেঙে যেতে হয়।

তিনি বলেন, জনগণের ভালোবাসা না থাকলে ক্ষমতায় থাকাও অনিশ্চিত হয়ে যায়, জীবন রক্ষাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

জাহিদ হোসেন বলেন, অন্যদিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে, তিনি ১৯৮১ সালের ৩০ মে শাহাদাত বরণ করেছেন। কিন্তু তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের জানাজায় মানুষ উজাড় করে অংশ নিয়েছিল।

তিনি বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি, বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি, মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় আটক রাখা হয়েছিল। কিন্তু, আল্লাহর মেহেরবানিতে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি ইন্তেকাল করার পর সারা দেশের মানুষ তার কফিনের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং শ্রদ্ধা জানিয়েছে।

তিনি বলেন, যারা গর্ব ও দম্ভ করেছিলেন, আজ তাদের অবস্থান কোথায়, সেটিই সময়ের শিক্ষা।

সবশেষে জাহিদ হোসেন বলেন, আমাদের আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখা উচিত এবং অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। আমাদের বর্তমানকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হয়।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

জেটেবের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. ফখরুল আলমের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার এ বি এম রুহুল আমীন আকন্দের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় সংগঠনটির নেতাকর্মী ও জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

Related Articles

Back to top button