বন্যার্তদের পাশে থাকবে আজহারীর হাসানাহ ফাউন্ডেশন

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবিক দায়িত্বের অন্যতম প্রকাশ। তবে সব সহায়তা একই ধরনের হতে হবে—এমন নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিক ত্রাণ নিয়ে কাজ করে, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেয়। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বন্যাকবলিত মানুষের পাশে থাকার নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ড. মিজানুর রহমান আজহারীর ‘হাসানাহ ফাউন্ডেশন’। নিজেদের মূল লক্ষ্য ও কর্মপরিধি অক্ষুণ্ণ রেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও জনপ্রিয় ইসলামি আলোচক মিজানুর রহমান আজহারী।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে বিশেষ উদ্যোগ হাসানাহ ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। যাচাই-বাছাই শেষে সীমিত পরিসরে এসব প্রতিষ্ঠানের পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রমে অংশ নেবে ফাউন্ডেশন।

নিজের ফেসবুক পোস্টে মিজানুর রহমান আজহারী বলেন, বর্তমান যুগ বিশেষায়নের যুগ। তাই সব প্রতিষ্ঠানকে সব ধরনের কাজ করতে হবে—এমন প্রত্যাশার পরিবর্তে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের উচিত নিজস্ব লক্ষ্য, নীতিমালা ও কর্মপরিধির মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা।

ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্তদের প্রতি শুভকামনা আজহারী বলেন, বর্তমান বন্যা পরিস্থিতিতে বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যারা ত্রাণ, উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তাদের প্রতি আন্তরিক দোয়া ও শুভকামনা রয়েছে।

তিনি জানান, অনেক শুভানুধ্যায়ী হাসানাহ ফাউন্ডেশনের কাছ থেকেও একই ধরনের উদ্যোগ প্রত্যাশা করেছেন। তাদের ভালোবাসা, আস্থা ও প্রত্যাশার জন্য তিনি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থেকে সরে নয় আজহারী বলেন, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই হাসানাহ ফাউন্ডেশন শিক্ষা, মূল্যবোধ গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, দুর্যোগকবলিত মানুষের কষ্টে তারা উদাসীন থাকবে।

তিনি জানান, ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বন্যাকবলিত এলাকার জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনরুদ্ধারে কাজ করা হবে।

শিক্ষাকে কেন্দ্র করে বহুমাত্রিক কার্যক্রম নিজেদের চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে আজহারী জানান, গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা-সহায়ক উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে কুরআন অলিম্পিয়াড ও সিরাত অলিম্পিয়াড সফলভাবে আয়োজন করা হয়েছে। বর্তমানে হাদিস অলিম্পিয়াড আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে।

তিনি আরও জানান, বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আরবি ভাষার শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ফাউন্ডেশনের কনফারেন্স রুমে এ-সংক্রান্ত একাধিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুপেয় পানি সরবরাহ ও বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের কাজও চলমান রয়েছে।

সমন্বিত শিক্ষা কারিকুলাম ও গবেষণা আজহারীর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি সমন্বিত শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নের লক্ষ্যে দেশ-বিদেশের কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় চলছে।

এ ছাড়া আর্লি চাইল্ড এডুকেশন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এবং একটি কার্যকর রূপরেখা প্রণয়নের কাজও এগিয়ে চলছে।

নওমুসলিমদের জন্য বিশেষ সহায়তা কাঠামোর আহ্বান ফেসবুক পোস্টে আজহারী বাংলাদেশে নওমুসলিম ভাই-বোনদের জন্য একটি সুপরিকল্পিত ও স্বতন্ত্র সহায়তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, শুধু আবেগঘন মুহূর্তে আর্থিক সহায়তা দিলেই যথেষ্ট নয়। বরং তাদের মৌলিক দ্বীনি শিক্ষা, নিয়মিত তারবিয়াহ (প্রশিক্ষণ) এবং সামাজিক পুনর্বাসনের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

তার মতে, একটি নির্দিষ্ট সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য নিবেদিত প্রতিষ্ঠান ও লক্ষ্যভিত্তিক কাজের কোনো বিকল্প নেই।

আর্থিক স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি ফাউন্ডেশনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে আজহারী জানান, ব্যক্তিগত অর্থায়নের মাধ্যমে হাসানাহ ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। পরে শুভানুধ্যায়ী ও সহযোগীদের সহায়তায় এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে।

তিনি বলেন, এটি একটি অলাভজনক এবং সরকার নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। ফাউন্ডেশন থেকে তিনি নিজে কিংবা ট্রাস্টি বোর্ডের কোনো সদস্য কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন না। বরং প্রতিষ্ঠার পর থেকে তারাসহ ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত অনুদান দিয়ে আসছেন।

তিনি আরও জানান, ফাউন্ডেশনের প্রতিটি অর্থব্যয় নিরীক্ষা ও অডিটের আওতাভুক্ত। প্রথম বছরের আয়-ব্যয়ের অডিট একটি স্বতন্ত্র অডিট ফার্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। দাতাদের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে দেওয়া অর্থ অন্য কোনো খাতে ব্যয় করার সুযোগ বা নৈতিক অধিকার কারও নেই।

আজহারীর ভাষায়, আমানতের হক যথাযথভাবে আদায় করা তাদের নীতিগত ও শরয়ি দায়িত্ব।

দায়িত্বের সুষ্ঠু বণ্টনই টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি পোস্টের শেষাংশে তিনি বলেন, যে জাতি দায়িত্বের সঠিক বিভাজন বুঝে এবং লক্ষ্যভিত্তিক কাজের মূল্যায়ন করতে পারে, সেই জাতিই টেকসই উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি সফলতার পথে এগিয়ে যায়।

তার মতে, প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করলে সম্মিলিতভাবে সমাজের জন্য আরও কার্যকর ও স্থায়ী কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব।

হাসানাহ ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—মানবিক সহায়তা শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের মাধ্যমেও সমাজকে শক্তিশালী করা যায়। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের পরিকল্পনা সেই দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং লক্ষ্যভিত্তিক কার্যক্রমের ওপর গুরুত্বারোপ ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হতে পারে।

Related Articles

Back to top button