বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে: অধ্যাপক রেহমান সোবহান


বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে এবং এই পরিবর্তন ঠেকাতে উন্নত দেশগুলোর বাজারে হস্তক্ষেপ ও শুল্কের পদক্ষেপ টেকসই নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মূল কাজ হওয়া উচিত বিশ্বজুড়ে নিজস্ব মূল্যশৃঙ্খল (ভ্যালু চেইন) শক্তিশালী করা এবং চীন ও ভারতের মতো প্রতিবেশী অর্থনীতির সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো।
শনিবার (৩ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিজঅর্ডার: ইমপ্লিকেশনস ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’ শীর্ষক এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, দীর্ঘ সময় পর একটি নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উত্থান দেখা যাচ্ছে, যার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এশিয়ার দিকে অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাবের স্থানান্তর। পণ্য বাণিজ্যে এশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার কারণে এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত জমেছে। এর ফলে সহায়তার জন্য এখন আর কেবল পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না, তৈরি হয়েছে বিকল্প উৎস। এতে আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ ও কম আধিপত্যশীল বিশ্বব্যবস্থা গড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বাণিজ্য ও প্রযুক্তির চিত্র বদলের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, বর্তমানে বিশ্বের ১২০টি দেশের মধ্যে ৭০টিরই প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্র ও পেটেন্ট প্রকাশেও চীন এখন বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এছাড়া সরকারি পর্যায়ে মূলধন স্থানান্তরের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারীও এখন চীন, যা একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের দখলে ছিল।
উন্নত দেশগুলোর ভূমিকার সমালোচনা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এতদিন বিশ্ব অর্থনীতিতে আধিপত্য করা উন্নত দেশগুলো এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে বাজারের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মোকাবিলা না করে হস্তক্ষেপের পথ বেছে নিয়েছে। শুল্কের চাপে বিভিন্ন দেশকে নির্দিষ্ট পণ্য কিনতে ও নির্দিষ্ট স্থানে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা অর্থনীতির স্বাভাবিক যুক্তির পরিপন্থী। ডব্লিউটিওর মতো নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও আজ প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। তবে এসব কৃত্রিম পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য পরিবর্তনের গতি থামাতে পারবে না বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশের করণীয় সম্পর্কে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা বাংলাদেশকে সামলাতে হয়েছে। দেশের প্রধান স্বার্থ অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা। তাই বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সীমিত না রেখে এশিয়ায় তৈরি হওয়া নতুন সুযোগের সঙ্গে দেশের মূল্যশৃঙ্খলকে শক্তভাবে যুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে চীন ও ভারতের মতো অর্থনৈতিক পরাশক্তির প্রতিবেশী হওয়ার সুফল এখনো পুরোপুরি নেওয়া যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহুমুখীকরণের কথা কাগজে-কলমে থাকলেও চিন্তার প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা এখনো দুর্বল।
তিনি আরও বলেন, শুধু বঙ্গোপসাগর নয়, স্থলভাগেও বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। পদ্মা ও যমুনা সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে স্থলসংযোগের বড় সুযোগ তৈরি করেছে। ভারত ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, তবে তা ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গঠনে এবং বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।




