আদাবরে দিনে গ্রেপ্তার, রাতে গুলি: সিসিটিভি বলছে ভিন্ন কথা


রাজধানীর আদাবরে বাড়ি দখলের চেষ্টা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের ধরতে গিয়ে হামলার মুখে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর দাবি করেছে পুলিশ। এতে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে গুলিবিদ্ধ দুজনসহ চারজনকে গ্রেপ্তاরে তথ্য জানিয়েছে তেজগাঁও বিভাগ।
তবে অভিযানের ১০ ঘণ্টা আগের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বলছে ভিন্ন কথা। ফুটেজ বলছে, মধ্যরাতের অভিযান নয়, দিনে দুপুরে নবোদয় কাঁচাবাজার থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে আদাবর থানা পুলিশ। এ চারজনের মধ্যে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় সাগর ওরফে ছোট বিগার (২৪) নামের একজনকে। পরে মোহাম্মদপুর থানার নবীনগর হাউজিং এলাকায় তার বাসায় তল্লাশি চালাতে যায় পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ১১ মিনিটে নবীনগর ৩ নম্বর রোডে সাগরের বাসার সামনে সিএনজি ও অটোরিকশা থেকে নামেন সাদা পোশাকে কয়েকজন যুবক। তাদের সঙ্গে হ্যান্ডকাফ পরিহিত সাগর। তাকে নিয়ে সোজা চলে যান ভবনের চার তলায় একটি ফ্ল্যাটে। তল্লাশি করা হয় ফ্ল্যাটের ওয়ারড্রব থেকে শুরু করে প্রতিটি রুমের কোনায় কোনায়। তবে কিছুই মেলেনি। পরে সাগরকে দিয়ে একে একে ডেকে আনা হয় রাশেদ ও শাকিবকে। রাশেদ বাসায় প্রবেশ করার পরে তাকে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। কিন্তু শাকিব বাসার সামনে এসে পরিস্থিতি খারাপ বুঝতে পেরে সটকে পড়ার চেষ্টা করেন। তবে তাকে ধাওয়া করে ঢাকা উদ্যান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রাত ৮টা ৮ মিনিটে সাগর ও শাকিবকে নিয়ে বের হয়ে সিএনজিতে তুলতে দেখা যায়।
আদাবর থানার শেখেরটেক ৬ নম্বর এলাকার যে ভবনে হামলার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার ও গুলি করা হয়েছে, সেই ঘটনায় তারা কেউই জড়িত নয় বলে দাবি করেছে পরিবার। পুলিশের নথি বলছে, গুলিবিদ্ধ দুই আসামিসহ চারজনই চিহ্নিত ছিনতাইকারী। তাদের বিরুদ্ধে আদাবর থানাসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। তবে দিনের আলোতে গ্রেপ্তারের ১৩ ঘণ্টা পর রাতের অন্ধকারে গুলির বিষয়ে কোনো উত্তর দেননি কথিত অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া আদাবর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর।
গুলিবিদ্ধ আসামির পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আদাবর থানার নবোদয় কাঁচাবাজারের মুরগির দোকানের সামনে থেকে সাগরকে আটক করে থানা পুলিশ। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সাগরকে নিয়ে নবীনগর হাউজিংয়ের সাগরের বাসায় অভিযানে যান আদাবর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) তরুণ কুমার হাওলাদারসহ ১০ জনের একটি দল। দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বাসায় তল্লাশি চালিয়েও কিছু না পেয়ে সাগরকে দিয়ে মোবাইল ফোনে ডেকে এনে শাকিব ও রাশেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর সাভার থেকে ডেকে আনা হয় রাজিব হাওলাদারকে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে চারজনকে থানায় দেখে আসলেও সাড়ে ৩টার দিকে স্বজনরা গুলির খবর পান।
নবোদয় বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার সাগর, শাকিব, রাজিবসহ অন্তত ১০ জনের একটি দল নবোদয় হাউজিংসহ আশেপাশের এলাকায় নিয়মিত ছিনতাই করে। রাজীব ঢাকা উদ্যান এলাকায় বাবু হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি।
সাগরের বড় ভাই মাসুম বলেন, “আমার ভাই অপরাধী হলে আইনের আওতায় আনেন। কিন্তু দিনের বেলা গ্রেপ্তার করে রাতে নিয়ে গুলি করলেন এটা কোনোভাবে মানতে পারছি না। শেখেরটেক ৬ নম্বরে যে বাড়িতে হামলার কথা বলা হচ্ছে, গ্রেপ্তার চারজনের কেউই এই ঘটনায় জড়িত না।”
সাগরের বাসার কেয়ারটেকার মো. জামাল বলেন, “সন্ধ্যায় সাড়ে ছয়টার দিকে সিএনজি ও অটোরিকশায় করে আট থেকে ১০ জন পুলিশ বাসায় আসে। তারা প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো বাসায় ছিল। সাগরকে হ্যান্ডকাফ পরিহিত অবস্থায় সুস্থ দেখলাম। সকালে শুনি তাকে নাকি গুলি করা হয়েছে।”
আদাবর থানার এসআই তরুণ কুমার বলেন, “ওরা চিহ্নিত ছিনতাইকারী। তারা প্রতিদিনই ছিনতাই করে। আমরা তাদের আড্ডাখানায় অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়ার পরে তারা আমাদের ওপর হামলার চেষ্টা করে।”
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, “এই ঘটনা আমার জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি। ঘটনার সময়ে রাজনৈতিক মিছিল ঠেকাতে ব্যস্ত ছিলাম।”
এর আগে তেজগাঁও বিভাগ থেকে জানানো হয়, রাজধানীর আদাবরে বাড়ি দখলের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযানে পুলিশের শটগানে দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। মঙ্গলবার রাত আড়াইটার দিকে আদাবর থানাধীন নবোদয় হাউজিং কাঁচাবাজার সংলগ্ন মেলার মাঠের পেছনের খালপাড় এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়। পুলিশের দাবি, অভিযানকালে আসামিরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টা করলে আত্মরক্ষার্থে দুই রাউন্ড শটগানের গুলি ছোড়া হয়। ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজিব ও সাগরের পায়ে গুলি লাগে এবং তাদের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।




