চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির ঘরোয়া দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্যের লড়াই দলের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরোপুরি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিকে পাশ কাটিয়ে দলীয় সংসদ সদস্যদের পৃথক যৌথ সমাবেশ এবং ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী যাচাই-বাছাই কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে শীর্ষ নেতৃত্ব ও সংসদ সদস্যদের দূরত্ব এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ও অস্বস্তি তৈরি করেছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কর্ণফুলী উপজেলার কলেজ বাজার এলাকার এ জে চৌধুরী কলেজ মাঠে ‘চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সংসদ সদস্যবৃন্দ’ ব্যানারে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ‘সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রতিবাদে’ আয়োজিত এই সমাবেশে অংশ নেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১২ আসনের এনামুল হক এনাম, চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সরওয়ার জামাল নিজাম ও চট্টগ্রাম-১৪ আসনের জসিম উদ্দিন।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১৫ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী নাজমুল মোস্তফা আমিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদের ব্যানারে হলেও সমাবেশে বক্তাদের বক্তব্যে জেলা বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

বিরোধের সূত্রপাত ইউপি প্রার্থী বাছাই ঘিরে মূলত স্থানীয় সরকার নির্বাচন বা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া ও সদস্যসচিব লায়ন হেলাল উদ্দীনের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে আসন্ন ইউপি নির্বাচন উপলক্ষে উপজেলাভিত্তিক বিশেষ কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এসব কমিটি স্থানীয় জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তথ্য সংগ্রহ করবে এবং ১০ দিনের মধ্যে গোপনীয় প্রতিবেদন জেলা কার্যালয়ে জমা দেবে।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই কমিটি গঠনের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আগে থেকেই কোনো কিছু জানানো হয়নি। উল্টো কমিটিতে জেলা আহ্বায়ক কমিটির নেতাদেরই একচ্ছত্র প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলেছেন সংসদ সদস্যরা। ইউপি নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় না করায় তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তুোষ দেখা দেয়। আর এর ঠিক পরের দিনই সংসদ সদস্যদের উদ্যোগে আলাদা এই যৌথ সমাবেশ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুই পক্ষের দূরত্ব প্রকাশ্য রূপ নেয়।

‘এমপিদের নিয়ে খেলবেন না’ সমাবেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম বলেন, বিভিন্ন দপ্তর থেকে সংসদ সদস্যদের কর্মসূちに না যাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁরা খবর পাচ্ছেন। দলীয় হাইকমান্ডের চূড়ান্ত মনোনয়নে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে এমন আচরণ কেন করা হবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, দক্ষিণ জেলা থেকে স্থানীয়ভাবে নিজেদের পছন্দমতো বিশেষ ব্যক্তিদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী বানানোর চেষ্টা চলছে, যা দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মধ্যে মারাত্মক বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

অন্যদিকে, জেলা বিএনপির সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই দাবি করে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একটি মহল দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় সংসদ সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ আছেন এবং দলের অনেক নেতাই তাদের এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।

জেলা কমিটিকে না জানিয়ে সমাবেশ নিয়ে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া দক্ষিণ জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের দাবি, সংসদ সদস্যদের এই যৌথ সমাবেশের বিষয়ে জেলা আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া বা সদস্যসচিব লায়ন হেলাল উদ্দীন কাউকেই আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব লায়ন হেলাল উদ্দীন কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, জেলা কমিটিকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এ ধরনের যৌথ সমাবেশ আয়োজন সরাসরি দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী। তিনি জানান, এ বিষয়ে দলের হাইকমান্ডকে লিখিতভাবে জানানো হবে এবং সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।

এদিকে তৃণমূল পর্যায়ে এই কোন্দল নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইসমাঈল বিন মনির এবং দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল হায়দার চৌধুরী মনে করেন, সংসদ সদস্যরা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে এভাবে যৌথ কর্মসূচি পালন করায় তৃণমূলের মাঝে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে এবং চলমান পরিস্থিতিতে সকল বিভেদ ভুলে একযোগে কাজ করা সময়ের দাবি।

সার্বিক বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ব্যস্ততার কারণে পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করবেন বলে জানান।

Related Articles

Back to top button