আলুতে কৃষকের হাহাকার: কেজিতে লোকসান ১৪-১৬ টাকা, ৫ হাজার কোটি টাকার শঙ্কা


রংপুর অঞ্চলে আলুর বাম্পার ফলন কৃষকের মুখে হাসি ফোটার বদলে বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে দাম পতন এবং হিমাগার ভাড়ার চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী হিমাগার থেকে আলু বিক্রি করতে গিয়ে কেজিতে ১৪ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুণতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। এর বিপরীতে ১২৪টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯২ টন (২৩.১ শতাংশ)। তবে হিমাগারে সংরক্ষিত এই আলুর প্রায় ৭৩.৮ শতাংশ বা ৮ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮ টন আলু এখনো অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে।
মাঠে ইতিমধ্যে নতুন আলুর চাষ শুরু হওয়ায় ‘মজুত, সীমিত সংরক্ষণ ক্ষমতা ও বাজারে কম দাম’—এই তিন সংকটে পড়েছেন চাষিরা। বর্তমান দরে কেজিতে ১৪ থেকে ১৬ টাকা লোকসান ধরলে শুধু রংপুর অঞ্চলেই কৃষকদের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আতাউর রহমান জানান, তিনি ৪৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করে ৬১ কেজির ৫ হাজার ২০০ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। হিমাগার থেকে আলু তোলাসহ কেজিতে খরচ পড়েছে ৭ টাকা। অথচ বর্তমানে হিমাগার গেটে আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১১-১৪ টাকায়। লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচই কীভাবে তুলবেন তা নিয়ে গভীর সংশয়ে আছেন তিনি। একই অবস্থা রংপুর মহানগরীর কৃষক ভুপাল চন্দ্র রহমানসহ এ অঞ্চলের হাজারো চাষির।
হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের গড় ব্যয় ১৬ টাকা, এর সঙ্গে কেজিপ্রতি ৬-৭ টাকা হিমাগার ভাড়া, বস্তা, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ যোগ করলে বাজারজাত পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৫ টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু মাত্র ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লোকসানের ভয়ে অনেক কৃষক হিমাগার থেকে আলু তুলতেই চাচ্ছেন না।
এর আগে গত বছরও দাম না থাকায় কৃষকরা দুই লাখ টন আলু হিমাগার থেকেই তোলেননি, যা পরবর্তীতে নষ্ট হয়েছে। হিমাগার মালিকরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
এই সংকট উত্তরণে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু এবং কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম কৃষকদের বাঁচাতে সরকারকে হিমাগার ভাড়ার ৫০ শতাংশ ভর্তুকি প্রদান অথবা সরাসরি ভর্তুকি দিয়ে ন্যায্যমূল্যে কৃষকদের কাছ থেকে কিছু আলু কিনে নেওয়ার জোরালো পরামর্শ দিয়েছেন।




