
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিলের ২৬টি সরকারি চেক জালিয়াতি করে প্রায় ৫১ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া তিন সরকারি কর্মচারী জামিন পেয়েছেন। রোববার (১২ জুলাই) ফুলগাজী আমলি আদালতের বিচারক মো. শহীদুল ইসলাম তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।
এর আগে, গত ৭ জুলাই উপজেলা পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর আব্দুল হালিম চৌধুরী বাদী হয়ে ফুলগাজী থানায় মামলা করার পর পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন— উপজেলা পরিষদের সাবেক কম্পিউটার অপারেটর পার্থ সারথী পাল (বর্তমানে ছাগলনাইয়ায় কর্মরত), বর্তমান অফিস সহায়ক মো. ফিরোজ ও নুর ইসলাম।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের আইনি এখতিয়ার কেবল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। এই কারণে পুলিশ আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে বিষয়টি তদন্তের জন্য দুদকে পাঠিয়েছে।
মামলার বাদী আব্দুল হালিম চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "রোববার মামলার শুনানির বিষয়ে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। আদালতে যাওয়ার জন্য কোনো নোটিশ পাইনি এবং বাদীপক্ষের কোনো আইনজীবী সেখানে উপস্থিত ছিলেন কি না, তাও আমার জানা নেই।"
ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নিশাত তাবাসসুম জানান, উপজেলা পরিষদের এজাহারের ভিত্তিতে প্রথমে থানায় মামলা নেওয়া হলেও আইনি কারণে এটি পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত নয়। তাই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে মামলাটি দুদকে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্তরা জামিন পেয়েছেন নাকি অব্যাহতি—এটি সম্পূর্ণ আদালতের সিদ্ধান্ত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩ মার্চ পর্যন্ত আট মাসে ২৬টি চেকে এই জালিয়াতি করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) স্বাক্ষরের পর চেকের মূল অঙ্কের সঙ্গে কৌশলে অতিরিক্ত ২ লাখ টাকা এবং কথার অংশেও সমপরিমাণ অর্থ লিখে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করা হতো।
প্রকৃত অনুমোদিত অর্থ: ৭ লাখ ৪৫৫ টাকা। উত্তোলনকৃত মোট অর্থ: ৫১ লাখ ৪৫৫ টাকা। প্রথম জালিয়াতি: ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই অফিস আপ্যায়ন খাতের ৩ হাজার টাকার চেকে অতিরিক্ত ২ লাখ যোগ করে ২ লাখ ৩ হাজার টাকা তোলা হয়। ২০২৬ সালের ৩ মার্চ গাড়ির জ্বালানি বিলের ১৬ হাজার ৭২২ টাকার চেকেও একইভাবে অতিরিক্ত ২ লাখ টাকা যোগ করা হয়।
দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তুতিকালে সদ্য বিদায়ী ইউএনও এবং উপজেলা পরিষদের প্রশাসক ফাহরিয়া ইসলাম চেকবইয়ের কাউন্টারফয়েল ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট মেলাতে গিয়ে এই বিশাল অসঙ্গতি ধরে ফেলেন। তবে এই দীর্ঘ সময়ে প্রশাসনিক তদারকিতে ব্যর্থতার কারণে বিদায়ী ইউএনও ফাহরিয়া ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
থানায় মামলা করার কারণ ব্যাখ্যা করে ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, "মামলাটি সরাসরি দুদকে করা হলে যথাযথ হতো। তবে সে সময় বিদায়ী ইউএনও আমাকে জানিয়েছিলেন যে অভিযুক্তরা আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছিলেন। তাদের দ্রুত হাজতে পাঠানোর উদ্দেশ্যেই হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে থানায় মামলা করা হয়েছিল।"
জেলা প্রশাসক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "আদালত থেকে জামিন পেলেও অভিযুক্ত তিন কর্মচারী ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদে তাদের কর্মস্থলে যোগ দিতে পারবেন না। আজ সোমবার (১৩ জুলাই) তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।"
এদিকে দুদকের নোয়াখালী সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক জাহেদ আলম এবং ফুলগাজী থানার ওসি এস এম মিজানুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, আদালত মামলার ডকেট দুদকে পাঠানোর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন এবং এখন থেকে জালিয়াতির পেছনে কারা জড়িত বা কারা উপকৃত হয়েছে তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখবে দুদক।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ আরিফ হোসেন চৌধুরী, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান,
আইন উপদেষ্টা: এ্যাডভোকেট জাকির হোসেন।
Copyright © 2026 Rajdhani Suprovat - রাজধানী সুপ্রভাত. All rights reserved.