
ঢাকায় যেকোনো সময় ৭ থেকে ৭.৫ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ৩০০ থেকে ৫০০ বছরের ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তির চক্র বা রিটার্ন পিরিয়ড প্রায় পূর্ণ হওয়ায় এই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এমন দুর্যোগ ঘটলে রাজধানী মারাত্মক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
ভেনিজুয়েলায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্প এবং গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ঢাকার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ছোট ছোট এসব কম্পন মূলত মাটির নিচে জমে থাকা বিশাল শক্তির আগাম বার্তা দিচ্ছে।
ভূমিকম্প ঝুঁকির প্রধান কারণ ও ভৌগোলিক অবস্থান
বাংলাদেশ মূলত তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা প্লেট) সংযোগস্থলে অবস্থিত। ঢাকার কাছেই মধুপুর ফল্ট এবং উত্তর-পূর্বে ডাউকি ফল্ট সিস্টেম রয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বড় কোনো শক্তি নির্গত হয়নি। ফলে সেখানে তীব্র চাপের সৃষ্টি হয়ে আছে।
ঢাকার মূল অবকাঠামোগত দুর্বলতা
নরম মাটি ও জলাশয় ভরাট: বুয়েটের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী জানান, ঢাকার বহু এলাকা জলাশয় ভরাট করে বালু ও নরম পলিমাটি দিয়ে গড়ে উঠেছে। তীব্র ঝাঁকুনিতে এই মাটি তরল পদার্থের মতো আচরণ করবে, ফলে বহুতল ভবন ধসে বা দেবে যেতে পারে।
বিল্ডিং কোড না মানা: জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) না মেনে ভবন তৈরি করা। বর্তমানে সারা দেশে ৪ থেকে ১০ তলা ভবন রয়েছে প্রায় ২০ লাখ।
বিশাল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা: রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার মহানগর এলাকায় প্রায় ২১ লাখ স্থাপনা রয়েছে। ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়তে পারে এবং প্রায় সাড়ে আট লাখ ভবন ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ৪ তলার ওপরে থাকা ভবনগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
উদ্ধারকাজে প্রতিবন্ধকতা: পুরান ও নতুন ঢাকার অলিগলি সংকীর্ণ হওয়ায় উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা কঠিন হবে। এছাড়া গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ লাইনে বিস্ফোরণ ঘটে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।
সক্ষমতার অভাব: ঢাকার ধসে পড়া ভবন অপসারণ ও উদ্ধারের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির বড় ঘাটতি রয়েছে।
রাজউক ও ভূতাত্ত্বিকদের বক্তব্য
রাজউক প্রতিনিধি জানান, বর্তমানে মানসম্মত ভবন নিশ্চিতের চেষ্টা করা হলেও ঝুঁকি হ্রাসে নিয়মিত কোনো রুটিন কাজ করা হচ্ছে না। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবন ভেঙে চাপ পড়েই ৯০ শতাংশ ক্ষতি হয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে ভবনগুলো মজবুত করা জরুরি।
দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি করণীয়
ভূমিকম্প প্রতিরোধ সম্ভব না হলেও পূর্বপ্রস্তুতি ও সঠিক প্রকৌশল ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এজন্য যা করা প্রয়োজন:
কঠোর বিল্ডিং কোড: নতুন ভবন নির্মাণে মাটি পরীক্ষা (লিকুইফ্যাকশন টেস্ট) ও বিএনবিসি মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা।
রেট্রোফিটিং: পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে প্রকৌশল পদ্ধতিতে কলাম ও বিমের শক্তি বাড়ানো।
সড়ক প্রশস্ত করা ও আশ্রয়কেন্দ্র: সংকীর্ণ রাস্তা প্রশস্ত করা এবং পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ও আশ্রয়কেন্দ্র নিশ্চিত করা।
কমিউনিটি ভলান্টিয়ার তৈরি: ভূমিকম্পের পরবর্তী প্রথম কয়েক ঘণ্টা অতি গুরুত্বপূর্ণ, তাই স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও উদ্ধারকারী দলের দক্ষতা বাড়ানো।
বিকেন্দ্রীকরণ: ঢাকা থেকে জনসংখ্যার চাপ কমাতে স্যাটেলাইট সিটি ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করা।
পরিকল্পিত বাস্তবায়ন: স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে দ্রুত তা বাস্তবায়ন শুরু করা।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ আরিফ হোসেন চৌধুরী, নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান,
আইন উপদেষ্টা: এ্যাডভোকেট জাকির হোসেন।
Copyright © 2026 Rajdhani Suprovat - রাজধানী সুপ্রভাত. All rights reserved.